ছাত্র রাজনীতির অপচর্চা

” অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ- পৃথিবীতে আজ
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা “
                      ~ জীবনানন্দ দাশ

হুমকিতন্ত্র , শাসকের দর্প আর ক্ষমতার দাদাগিরির ঘোর আঁধারে ক্রমশ নিমজ্জিত পশ্চিমবঙ্গ ও রাজ্যর শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী। একটা বড় সময় বন্ধ রইলো শিক্ষক নিয়োগ। যোগ্য- অযোগ্য তালিকা দিতে ব্যর্থ হল কমিশন।গত দু বছর বন্ধ হলো প্রায় আট হাজার সরকারি বিদ্যালয়। কলকাতার হিন্দু স্কুলের মত ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধুঁকছে। রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকা গুলিতে একটা বড়ো অংশের স্কুলে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা দুই অঙ্কের নীচে। রাজ্য প্রায় ১৯ হাজার স্কুলে শিক্ষক শিক্ষিকা মাত্র দুজন। ২০২৫ উচ্চমাধ্যমিকে পরীক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৩ লাখ। রেজিস্ট্রেশন করিয়েও পরীক্ষায় বসেনি ৫৫ হাজার পড়ুয়া। যত ছাত্র ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পাশ করেছিল, তার বড় অংশই বসেনি ২০২৫-এর উচ্চমাধ্যমিকে। ওবিসি মামলায় একটা বড় সময় থমকে রইল ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের কলেজগুলোর ভর্তি প্রক্রিয়া। আবার এই বছরের শুরুতেই উচ্চ মাধ্যমিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার একটি বিষয়ের পরীক্ষায় ৪০ নম্বরের মধ্যে দেখা গেল ১০ নম্বর সিলেবাস বহির্ভূত প্রশ্ন।

আর একদিকে তাকালে দেখা যাবে প্রায় আট বছর বন্ধ ছাত্রভোট। কলেজ – বিশ্ববিদ্যালয় গুলোয় ইউনিয়নের নামে চলছে বহিরাগতদের অবৈধ কার্যকলাপ। স্বপ্নদীপের মৃত্যু, আর জি কর এর অভয়া থেকে বছর না ঘুরতেই সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজ সহ নানা প্রান্তের কলেজ ক্যাম্পাসের নানা অনভিপ্রেত ঘটনা। যার মধ্যে নজরুল মঞ্চে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কেকে-র মৃত্যুও উল্লেখযোগ্য। ফলত, কলেজ-ক্যাম্পাসে নেই নিরাপত্তা। উল্টে ছাত্রভর্তি থেকে কলেজ ফেস্ট এমন নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে চলছে বিপুল পরিমাণ অর্থের অনৈতিক লেনদেন। আইনের শাসন নেই আছে শাসকের আইন।

ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রদের রাজনৈতিক সচেতনতা এই দুটোরই প্রয়োজনীয়তা সিস্টেমেটিক্যালি ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা চলছে। ছাত্র রাজনীতি মানেই এখন তোলাবাজি আর মস্তানি। অনেকেই বলেন তথাকথিত ভালো ছেলেমেয়েরা কেন ছাত্ররাজনীতি করবে ? কিন্তু এটা সবসময় আমাদের মাথায় রাখতে হবে ছাত্র রাজনীতিতে যোগদান পড়াশোনারই একটা অংশ। ইউনিয়ন রুম কোন পাইয়ে দেবার জায়গা নয় বরং ইউনিয়ন রুম যৌথতার পাঠ শেখায় , শেখায় অধিকার আদায় করে নিতে। ছাত্র রাজনীতি বিশ্ব রাজনীতিকে দিশা দেখায় , সমাজ বদলের কথা বলে। পৃথিবী জুড়ে এই ছাত্র রাজনীতিই আদর্শে বলিয়ান ভবিষ্যতের নেতা তৈরি করেছে যার উদাহরণ হাজারও। তবে এটাও ঠিক যে ছাত্র রাজনীতি থেকে সবাই ভবিষ্যতে নেতামন্ত্রী হবেনা কিন্তু তারা সবাই অধিকার সচেতন নাগরিক হবে। যেটা বর্তমানের নিজের টুকু বুঝে নেবার সিস্টেমে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বেশি করে প্রয়োজনীয়। আর এই কথাগুলোই ভুলিয়ে দিতে মরিয়া শাসকদল, তাই তারা ছাত্রভোট চায়না। কারন ছাত্রভোট বন্ধ থাকলে এলাকা ভিত্তিক কলেজ গুলোয় স্বমহিমায় তোলাবাজি ও দাদাগিরির সংস্কৃতি জারি রাখা যাবে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ থেকে ২০১১ প্রায় অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় জুড়ে পশ্চিমবঙ্গবাসী মূলত তিন ঘরানার ছাত্র রাজনীতি দেখেছে। দেখেছে বৈপ্লবিক বামপন্থা, দক্ষিণপন্থা ও সংসদীয় বামপন্থা। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন প্রতিষ্ঠানিক আর্থিক দুর্নীতি , সাংস্কৃতিক অধঃপতন , সরকারের সর্বগ্রাসী মানসিকতা এবং  শিক্ষাঙ্গনে ধর্ষণ সংস্কৃতি কখনো দেখেনি। উল্টে যা দেখছে তা হলো শাসকের ঝোলভোরা প্রতিযুক্তি আর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা।

দেশের ভবিষ্যৎ ছাত্র সমাজ তাই তাদের হাতে আগামীকে সুরক্ষিত রাখতে তাদের শিক্ষায় সংস্কৃতিতে বলীয়ান করা জরুরি। ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে শিক্ষার অধিকার পৌঁছে দিতে হবে ঘরে ঘরে। দুর্নীতিমুক্ত , দুষ্কৃতী মুক্ত ক্যাম্পাস ফিরিয়ে আনতে হবে যেখানে সুস্থ পরিবেশে উন্নত মেধার, উচ্চ সংস্কৃতির চাষ হবে। জনতার হাতিয়ার বানাতে হবে শিক্ষাকে। এই অন্ধকারের সময় কাটিয়ে তাই আলো আনতেই হবে। যে আলোয় অজ পাড়া গাঁ থেকে মফস্বল হয়ে শহর কিংবা নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সবার স্বপ্ন বাঁচবে। ধূসর এই মরুভূমির মাঝে স্বপ্নের ছোটো ছোটো কুঁড়িরা হবে এক টুকরো মরুদ্যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *