দেওয়াল জুড়ে লিখতে হয়, ওয়াল জুড়েও লড়তে হয়…

লিঙ্কডিন শুরু হয় ২০০৩-এ, ফেসবুক ২০০৪-এ, ২০০৬-এ টুইটার, আর হোয়াটসঅ্যাপ আর ইনস্টাগ্রামের সূত্রপাত ২০১০-এ। আর আমাদের,  মানুষের শুরুয়াৎ? অনেক আগেই …..

তবে আমরা কি ‘এক ঘন্টাও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ডিটক্স হতে পারিনা?’ উত্তর পাওয়া কঠিন। কারণ আজ সবার উপর সোশ্যাল মিডিয়া সত্য! যেন তাহার উপর আর নাই কিছুই। এর মাঝেই ‘গেল গেল’ রব উঠে যায় পৃথিবী জুড়ে। এইবুঝি সব বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ নীলের উপর সাদা F’টা মুছে গেলে কি না কি হয়ে যায়। টুং টুং করে ম্যাসেজের টোন কানে না বাজলে অস্বস্তি হয়। ডিজিটাল নিস্তব্ধতায় মুড়ে যায় বিশ্ব। চিরতরে, কেবল কয়েক ঘণ্টার জন্য নয়। ধরে নিচ্ছি যে, সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলেও গুগল, ইউটিউব কিংবা ইমেল ব্যবহার করা যাবে আগের মতোই। সোশ্যাল মিডিয়া উধাও হয়ে গেলে কি ভাল হবে, না কি মন্দ? বলা কঠিন। কার ভাল, সেটাও একটা প্রশ্ন বটে। এবার সেই ডিবেটও সোশ্যাল মিডিয়ায় হবে কিনা জানা নেই। তবুও আজ পৃথিবীর ৯০ শতাংশের বেশি সংস্থা আজ সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্য নেয় চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে। সোশ্যাল মিডিয়া উধাও হয়ে গেলে সংস্থাগুলোকে নিয়োগকার্যেও খুঁজতে হবে নতুন মডেল। প্রায় ৪০ লক্ষ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন দেয় ফেসবুকে, পাঁচ কোটি প্রতিষ্ঠান ফেসবুকে যোগাযোগ রাখে ক্রেতাদের সঙ্গে। তাই সোশ্যাল মিডিয়া ‘ভ্যানিশ’ হয়ে গেলে বহু ব্র্যান্ডই যে টিকে থাকতে পারবে না, সে কথা বলা বাহুল্য। কাজ হারাবেন লক্ষ লক্ষ মানুষ, লক্ষ লক্ষ কনটেন্ট ক্রিয়েটর। বাজারে ধস নামবে, এ সব অনুমান করা যায় সহজেই। বিশ্বব্যাপী এক চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা তৈরি হতেই পারে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পশ্চিমা বিশ্বের শিক্ষার মান অনেক নেমে গেছে। ১৯৮২ সালের পর গত বছরই প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে সাহিত্য পড়ার হার সবচেয়ে কম। তাই নয়, প্রতিদিনই বাড়ছে তরুণদের অনলাইনে কাটানো সময়ের হার। পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সীরা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৫ ঘণ্টা অনলাইনে কাটায়। যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে কিশোর বয়সীদের মধ্যে এককিত্বের মাত্রা সবচেয়ে বেশি এবং ২০০৭ সালে আইফোন বাজারে আসার পর থেকে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটেছে। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে ডিপ্রেশন-এর কেস।ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড জগতে কেউ কাউকে স্পর্শ করতে পারে না। কেবল লাইক কমেন্ট করতে পারে। খুব বেশি হলে শেয়ার করার সুযোগ পায়। এর বেশি নয় ….

এসবের মাঝেই বহু প্রশ্ন এদিক ওদিক উঁকি দেয়। আর যদি এসব থেকেই যায়, তবে? ‘রিয়েল আর রিল’ – দুটোই কি ভয়ানক? উত্তর পাওয়া যায় না।

সত্যি বলতে কি, বহুদিন হল কেউ আর কাউকেই জিজ্ঞাসাও করে না যে, কেমন আছো? কেননা সোশ্যাল মিডিয়াই আজকাল মানুষের হয়ে সব কথা বলে দেয়। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট। সে কেমন আছে, কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, সবকিছুই যেন সকলের নখদর্পণে। শুধু তার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলটি সবুজ থাকলেই হল। সবুজ নেই মানে, সেও নেই। বাস্তব জীবন থেকেও আমরা ফেক ‘ওয়ালে’ বেশি সময় ব্যায় করি।

‘My life is an exhibition’– আমাদের প্রত্যেকের জীবনই যেন একটা প্রদর্শনী। একটা মঞ্চ। একটা ভালো থাকার বা দেখানোর অভিনয় করে যেতে হবে ওই ফেক ওয়ালে। পরিপাটি কোনও ঘরের দেওয়ালে যেমন সাজানো থাকে পুতুল, সখের ঘড়ি আর দামি পেইন্টিং, তেমনই সকাল থেকে রাত অবধি আমি আমার ‘ওয়াল’ সাজানোর নিত্যনতুন জিনিস আবিস্কার করি। কখনও প্রিয় কবিতা, প্রিয় গান, রান্নার রেসিপি, আবার দুঃখ অভিমান নিয়ে লেখা একটুকরো আমার কথা। এত রকম আনন্দ আমার বাড়ির দেওয়ালে পাবো বুঝি? তাই আমরা খুঁজে নিয়েছি ফেসবুক ওয়াল আর ছবির দেশ Instagram। এক ক্লিকেই হাতের সামনে চলে আসে অজস্র অপশন। নামি-দামি ব্রান্ডের জুতো। জামা, পারফিউম আরও কত কি। সুন্দর করে ‘ইউশলিস্ট করে রাখি।’ তবুও পাশের বাজারের দোকানে একবার ঢু দিয়ে আসিনা। যাকগে। জীবনের দুঃখ স্কিপ না করতে পারলেও রিল পালটে দিলে ভালোই লাগে। Algorithm মেনেই আবার আমার মনমাফিকই রিল-ভিডিও সামনে এনে দেয়। এসব কি আর বাস্তব জীবনে সম্ভব? আমার মুখের প্রোফাইল বাঁ-দিক থেকে দেখতে ভালো লাগে সেলফিতে, আমার লেখা কবিতা যদি হয় ইংরেজিতে তাহলে লাইক পড়ে বেশি, খাবারের ছবি দিলে মোটেই পাত্তা পাচ্ছি না ফিডে– এহেন algorithm-এ আমরা কি একটু একটু করে নিজেকে পালটে ফেলছি? বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সাজাচ্ছি নিজেকে, যা কিছু বৈধতা দেয় আমার সত্তাকে সেখানেই ভিড় জমাচ্ছি। এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা করে চলছি প্রতিনিয়ত।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, ‘ভালো আছো’ কিনা জানতে চাইলে, ‘হ্যাঁ’ বলছে কেবলমাত্র ৪৫% জেন-জি ছেলেমেয়ে, যা এযাবৎকালের মধ্যে সবচাইতে কম। মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার মতন বন্ধু পাচ্ছে না। অনেকেই আবার মনের কথা বলবার জন্যই বেছে নিচ্ছেন কোনও এআই চ্যাটবট-কে! কিছুদিন আগেই যেমন লাস ভেগাস-এর এক ব্যক্তি একাকীত্ব কাটাতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে তাঁর নিজের ফোনটির সঙ্গে; তাঁর বক্তব্য, ফোনটির সঙ্গেই বিগত বছরগুলিতে সবথেকে বেশি সময় কাটিয়েছেন তিনি। শুনতে হাস্যকর হলেও, এ যেন এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের সূচনার ক্ষণ।

প্রশ্ন অনেক আছে। ভালো মন্দ বিচার করাও কঠিন। তবে ভারসাম্য বজায় রাখতে আমরা পারি না? ফেসবুকের বদলে একটু বেশিক্ষণ টেক্সট বুক পড়তে পারি না? রিলের তুলনায় রিয়েল লাইফে ভরসা করতে পারি না? নিজেদের প্রশ্ন করো। আমাদের অপেক্ষাতেই আজও খেলার মাঠগুলো ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। তারই সুযোগ নিচ্ছে প্রোমোটাররা। খেলার মাঠ বিক্রি করে দিচ্ছে। ছোটোবেলায় টেম্পল রান বা পাবজি’ খেলতে বেশ দারুণ লাগলেও। এখন বুঝতে পারি এই গেম আসলে আমাদের একা থাকতেই শেখায়। তার বদলে ‘আমি থেকে আমরা’ হয়ে উঠতে শেখায় ক্রিকেট টিম। গানের দল। নাটকের দল। একটা স্যাড স্টোরি দিলে ৫০ জন ‘সিন’ করে ঠিকই কিন্তু মনের গভীরে কেউ ‘সিন’ করেনা। ‘আমার রাত জাগা তারা’রাও সেই পড়ায় ব্যাচেই থেকে যায়। ম্যাসেঞ্জারের লিস্টে নয়। যত সহজে গোটা বিশ্বের তথ্য ঘরে বসেই হাতে পেয়ে যাচ্ছি আমরা ততই সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। এই অভ্যাস পালটে দেওয়াই আমাদের আসু কাজ। তাই ‘প্রেম পলিটিক্স পড়াশোনা’ – সবটাই আসলে অফলাইন কাজ। অনলাইন নয় ……

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *