মানুষ ও অ্যালগোরিদম

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগোরিদম আমাদের সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা কার সাথে বন্ধুত্ব রাখব, কার পোস্ট আমাদের স্ক্রিনে আসবে- সবই নির্ধারিত হয় ‘এনগেজমেন্ট’ অ্যালগোরিদমের মাধ্যমে। এর ফলে দূরে থাকা মানুষের সাথে যোগাযোগ সহজ হলেও, অনেক সময় ভার্চুয়াল জগতের মিথস্ক্রিয়া আমাদের আসল জীবনের সম্পর্কগুলোকে ফিকে করে দিচ্ছে। অনলাইন কেনাকাটা বা ই-কমার্স সাইটগুলোতে ‘রিকমেন্ডেশন ইঞ্জিন’ ব্যবহার করা হয়। আপনি কী কিনতে চান, তা আপনি বোঝার আগেই অ্যালগোরিদম আপনার পূর্বের ব্রাউজিং হিস্ট্রি বিশ্লেষণ করে আপনার সামনে তুলে ধরে। এটি আমাদের জীবনকে সুবিধাজনক করলেও ‘ইমপালসিভ বাইয়িং’ বা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা এক বিস্ময়কর বিবর্তনের সাক্ষী। মানব সভ্যতার ইতিহাসে চাকা আবিষ্কার থেকে শুরু করে শিল্প বিপ্লব পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বৈপ্লবিক, কিন্তু বর্তমানের ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তিকেই বদলে দিচ্ছে। এই বিপ্লবের কেন্দ্রে রয়েছে এক অদৃশ্য অথচ মহাশক্তিশালী গাণিতিক শক্তি- অ্যালগোরিদম।এক সময় অ্যালগোরিদম ছিল কেবল গণিতশাস্ত্রের জটিল সমীকরণ কিংবা কম্পিউটার বিজ্ঞানের যান্ত্রিক নির্দেশাবলি, কিন্তু আজ তা আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে এক অপরিহার্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

মানুষ এবং অ্যালগোরিদমের এই সম্পর্কটি অত্যন্ত নিবিড় এবং জটিল। মানুষ তার নিজের বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে অ্যালগোরিদম সৃষ্টি করেছে যাতে জীবনযাত্রা সহজতর হয়, কিন্তু আজ সেই সৃষ্টিই মানুষের চিন্তা, পছন্দ, আচরণ এমনকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করছে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন দেখা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করা- প্রতিটি মুহূর্তেই আমরা অ্যালগোরিদমের এক বিশাল জালের মধ্যে জড়িয়ে পরেছি। এটি কেবল আমাদের যান্ত্রিক সহায়তা দিচ্ছে না, বরং আমাদের অবচেতন মনকে পরিচালনা করছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, মানুষ কি তার তৈরি যন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, নাকি এটি মানুষের ক্ষমতারই এক নতুন সম্প্রসারণ? অ্যালগোরিদম কি কেবল একটি গাণিতিক কাঠামো, নাকি এটি আমাদের আগামীর সভ্যতার নতুন এক মস্তিষ্ক? মানুষ ও অ্যালগোরিদমের এই সহাবস্থান যেমন অবারিত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে নৈতিকতা, গোপনীয়তা এবং মানবিক স্বকীয়তা নিয়ে নানাবিধ সংশয়।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, অ্যালগোরিদম হলো কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার বা কোনো সমস্যার সমাধান করার জন্য কতগুলো সুনির্দিষ্ট এবং ধাপে ধাপে বিন্যস্ত নির্দেশাবলি। এটি অনেকটা রান্নার রেসিপির মতো- যেখানে কিছু কাঁচামাল (Data) দেওয়া হয় এবং ধাপে ধাপে নির্দেশ পালন করলে শেষে একটি নির্দিষ্ট ফলাফল (Output) পাওয়া যায়। তবে কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে এটি অনেক বেশি জটিল ও গাণিতিক। ‘অ্যালগোরিদম’ শব্দটি এসেছে নবম শতাব্দীর প্রখ্যাত পারস্য গণিতবিদ মুসা আল-খোয়ারিজমি-র নাম থেকে। তাঁর ল্যাটিন নাম ‘Algoritmi’ থেকেই এই শব্দটির উৎপত্তি। তিনি প্রথম গাণিতিক সমস্যার সমাধানের জন্য নিয়মমাফিক ধাপ ব্যবহারের ধারণা প্রবর্তন করেন। আধুনিক যুগে এসে অ্যালান টিউরিং এবং অন্যান্য কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা একে যন্ত্রের মাধ্যমে চালনা করার রূপ দান করেন। একটি অ্যালগোরিদম মূলত তিনটি প্রধান স্তরে কাজ করে। প্রথমে কিছু তথ্য বা Data গ্রহণ করা হয়। যেমন- আপনি যখন গুগল ম্যাপে গন্তব্য খোঁজেন, তখন আপনার বর্তমান অবস্থান এবং গন্তব্য হলো ইনপুট। তারপর অ্যালগোরিদম তার ভেতর থাকা হাজার হাজার গাণিতিক শর্ত (If-Then-Else) প্রয়োগ করে। ম্যাপের ক্ষেত্রে এটি ট্রাফিক, রাস্তার দূরত্ব এবং সময় বিশ্লেষণ করে। সব শেষে সবচেয়ে ভালো সমাধানটি প্রদান করে। যেমন- সবচেয়ে দ্রুততম রাস্তাটি আপনাকে দেখানো।

একটি আদর্শ অ্যালগোরিদম হতে হলে তাতে কিছু বিশেষ গুণ থাকতে হয়- প্রতিটি ধাপ হতে হবে স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন। কম্পিউটারকে কোনো অস্পষ্ট আদেশ দেওয়া যায় না। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর বা নির্দিষ্ট ধাপের পর অবশ্যই শেষ হতে হবে। এটি অনন্তকাল ধরে চলতে পারে না। এটি কত দ্রুত এবং কত কম মেমোরি ব্যবহার করে সমাধান দিতে পারছে, তার ওপর এর শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে। পুরানো দিনের অ্যালগোরিদমগুলো ছিল স্থির; অর্থাৎ মানুষ যা লিখে দিত, সে কেবল তা-ই করত। কিন্তু বর্তমানের মেশিন লার্নিং অ্যালগোরিদমগুলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণের কাছাকাছি। এগুলো কেবল নির্দেশ পালন করে না, বরং বিপুল পরিমাণ ডেটা থেকে নিজে নিজে শিখতে পারে। আপনি যখন বারবার কোনো নির্দিষ্ট ধরনের গান শোনেন, অ্যালগোরিদম বুঝতে পারে আপনার রুচি কেমন এবং সেই অনুযায়ী সে নতুন নতুন গানের পরামর্শ দেয়। একে বলা হয় ‘প্যাটার্ন রিকগনিশন’। ব্যাঙ্কিং লেনদেন যাচাই করা, ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করা, ফেসবুকে নিউজ ফিড সাজানো, এমনকি ইমেইলে স্প্যাম মেসেজ আলাদা করা- সবই ঘটছে অ্যালগোরিদমের জাদুকরী দক্ষতায়। অ্যালগোরিদম হলো মানুষের যুক্তিবোধের একটি গাণিতিক রূপান্তর। এটি নিজে চিন্তা করতে পারে না, কিন্তু মানুষের দেওয়া যুক্তির ওপর ভিত্তি করে এটি এমনভাবে কাজ করে যা মানুষের মেধার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এটি বর্তমান বিশ্বের এক নতুন ‘ভাষা’, যা অদৃশ্য থেকে আমাদের দৃশ্যমান জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

আধুনিক মানুষ তার ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে ঘুমানো পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তে একটি অদৃশ্য গাণিতিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এই প্রভাবটি যেমন ইতিবাচক তেমনি এর কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ঝুঁকিও রয়েছে। প্রাচীনকালে তথ্য সংগ্রহের জন্য মানুষকে লাইব্রেরি বা মানুষের দ্বারস্থ হতে হতো। আজ সার্চ ইঞ্জিন অ্যালগোরিদম (যেমন- গুগল) আমাদের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কোটি কোটি তথ্য এনে দিচ্ছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, আমরা কী শিখব বা জানব, তা নির্ধারণ করছে অ্যালগোরিদম। এটি কেবল আমাদের রুচি অনুযায়ী তথ্য দেখায়, ফলে আমরা নতুন বা বিপরীতধর্মী কোনো জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হই। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগোরিদম আমাদের সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা কার সাথে বন্ধুত্ব রাখব, কার পোস্ট আমাদের স্ক্রিনে আসবে- সবই নির্ধারিত হয় ‘এনগেজমেন্ট’ অ্যালগোরিদমের মাধ্যমে। এর ফলে দূরে থাকা মানুষের সাথে যোগাযোগ সহজ হলেও, অনেক সময় ভার্চুয়াল জগতের মিথস্ক্রিয়া আমাদের আসল জীবনের সম্পর্কগুলোকে ফিকে করে দিচ্ছে। অনলাইন কেনাকাটা বা ই-কমার্স সাইটগুলোতে ‘রিকমেন্ডেশন ইঞ্জিন’ ব্যবহার করা হয়। আপনি কী কিনতে চান, তা আপনি বোঝার আগেই অ্যালগোরিদম আপনার পূর্বের ব্রাউজিং হিস্ট্রি বিশ্লেষণ করে আপনার সামনে তুলে ধরে। এটি আমাদের জীবনকে সুবিধাজনক করলেও ‘ইমপালসিভ বাইয়িং’ বা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া ক্রেডিট স্কোর নির্ধারণ বা লোনের যোগ্যতা যাচাইয়েও এখন অ্যালগোরিদম ব্যবহৃত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যালগোরিদমের প্রভাব অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। মেডিক্যাল অ্যালগোরিদম এখন মানুষের চেয়েও নিখুঁতভাবে এক্স-রে, এমআরআই বা সিটি স্ক্যান রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে রোগ শনাক্ত করতে পারছে। হার্ট রেট মনিটর করা বা রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করার মতো পরিধানযোগ্য ডিভাইসগুলো অ্যালগোরিদমের সাহায্যে আমাদের স্বাস্থ্যের রিয়েল-টাইম আপডেট দিচ্ছে। গুগল ম্যাপস বা উবার-এর মতো পরিষেবাগুলো যাতায়াতের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। ট্রাফিক জ্যাম এড়ানো, দ্রুততম পথ খুঁজে বের করা এবং জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে অ্যালগোরিদমের কারণে। ভবিষ্যতের স্বচালিত গাড়ি (Self-driving cars) পুরোপুরি অ্যালগোরিদমের ওপর নির্ভরশীল, যা সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বর্তমানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় (Recruitment) অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে হাজার হাজার সিভি থেকে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হয়। এছাড়া ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে কাজের বণ্টন এবং পারিশ্রমিক নির্ধারণেও এর ভূমিকা অপরিসীম। তবে এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে দক্ষ মানুষও যান্ত্রিক ত্রুটি বা অ্যালগরিদমিক বায়াসের কারণে বাদ পড়ে যাচ্ছে। অ্যালগোরিদমগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে ব্যবহারকারী দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে আটকে থাকে। একে বলা হয় ‘ডোফামিন লুপ’। ক্রমাগত ছোট ছোট ভিডিও বা নোটিফিকেশন আমাদের মস্তিষ্কে আনন্দদায়ক হরমোন নিঃসরণ করে, যা শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল আসক্তিতে রূপ নেয়। এটি মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা (Attention Span) কমিয়ে দিচ্ছে এবং মানসিক অবসাদ বাড়িয়ে তুলছে। নির্বাচনী প্রচার এবং জনমত গঠনে অ্যালগোরিদম এখন তুরুপের তাস। মানুষের রাজনৈতিক পছন্দ বিশ্লেষণ করে তাকে নির্দিষ্ট ধরনের বিজ্ঞাপন বা খবর দেখানো হয় (Micro-targeting)। এটি অনেক সময় ভুল তথ্য বা ‘ফেক নিউজ’ ছড়িয়ে দিয়ে জনমতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।

মানুষ এবং অ্যালগোরিদমের মধ্যকার সম্পর্কটি এখন আর কেবল ব্যবহারের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন একটি সূক্ষ্ম দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। একদিকে মানুষের আবেগ ও নৈতিকতা, অন্যদিকে অ্যালগোরিদমের শীতল যুক্তি ও গাণিতিক দক্ষতা- এই দুইয়ের সংঘর্ষে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। মানুষ এবং অ্যালগোরিদমের এই লড়াইটি মূলত ‘চেতনা’ বনাম ‘ডেটা’র লড়াই। মানুষের যেকোনো সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে নীতিবোধ, সহানুভূতি এবং পারিপার্শ্বিক বিচার। কিন্তু অ্যালগোরিদম চলে কেবল লাভ-ক্ষতি বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের গাণিতিক যুক্তিতে। একটি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি (Self-driving car) যদি এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যেখানে দুর্ঘটনা অনিবার্য, তবে সে কাকে বাঁচাবে? একজন পথচারীকে নাকি গাড়ির আরোহীকে? এই নৈতিক সংকটের সমাধান মানুষের কাছে যতটা আবেগীয়, অ্যালগোরিদমের কাছে তা কেবলই একটি পরিসংখ্যানগত সিদ্ধান্ত। অ্যালগোরিদমের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন ডেটা। আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ, কথোপকথন, এমনকি গতিবিধিও আজ অ্যালগোরিদমের নজরদারিতে। মানুষ তার ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষা করতে চায়, কিন্তু আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোয় অ্যালগোরিদম আমাদের অজান্তেই আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করছে। এই ‘ডেটা সংগ্রহ’ বনাম ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’র দ্বন্দ্বটি বর্তমানে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অ্যালগোরিদম আমাদের কেবল তা-ই দেখায় যা আমরা পছন্দ করি। এর ফলে আমাদের চারপাশে একটি অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়, যাকে বলা হয় ‘ফিল্টার বাবল’। মানুষ স্বভাবগতভাবে নতুন ও বৈচিত্র্যময় চিন্তা গ্রহণ করে বিকশিত হয়। কিন্তু অ্যালগোরিদম আমাদের একই ধরনের চিন্তার বৃত্তে আটকে রেখে মানুষের মুক্তচিন্তা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। অ্যালগোরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চেয়ে দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে অনেক কাজ করতে সক্ষম। উৎপাদন শিল্প থেকে শুরু করে লেখালেখি বা গ্রাফিক ডিজাইনের মতো সৃজনশীল কাজেও অ্যালগোরিদম হানা দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, যন্ত্র যদি সব কাজ করে ফেলে, তবে মানুষের উপযোগিতা কোথায় থাকবে? এই ‘অটোমেশন’ বহু মানুষের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে, যা একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। অ্যালগোরিদমকে নিরপেক্ষ মনে করা হলেও এটি আসলে মানুষের দেওয়া ডেটা থেকেই শেখে। যদি ইনপুট ডেটায় কোনো বর্ণবাদী বা লিঙ্গবৈষম্যমূলক তথ্য থাকে, তবে অ্যালগোরিদমও সেই পক্ষপাতমূলক আচরণই প্রদর্শন করে। মানুষের সৃজনশীলতা আসে তার অভিজ্ঞতা, কষ্ট এবং গভীর অনুভূতি থেকে। অন্যদিকে, অ্যালগোরিদম কেবল কোটি কোটি পুরনো তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সংস্করণ তৈরি করে। এআই যখন কোনো কবিতা লেখে বা ছবি আঁকে, তাতে কারুকার্য থাকলেও ‘প্রাণ’ থাকে না। যন্ত্রের এই অনুকরণ বনাম মানুষের মৌলিক সৃষ্টির দ্বন্দ্বটি শিল্প ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। মানুষ এখন নিজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সিদ্ধান্তের জন্যও অ্যালগোরিদমের ওপর নির্ভরশীল। কোন সিনেমা দেখব, কোন রেস্তোরাঁয় খাব, এমনকি কার সাথে জীবনসঙ্গী হিসেবে কথা বলব- তাও অ্যাপের অ্যালগোরিদম ঠিক করে দিচ্ছে। এর ফলে মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ লোপ পাচ্ছে। আমরা অনেকটা অ্যালগোরিদমের পুতুলে পরিণত হচ্ছি।

মানুষ এবং অ্যালগোরিদমের মধ্যকার সম্পর্কটি এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের স্তরে নেই; এটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। অ্যালগোরিদমের সীমাহীন ক্ষমতা এবং মানুষের মৌলিক মানবিকতার মধ্যে একটি সুস্থ ও কার্যকর সামঞ্জস্য বজায় রাখাই আমাদের আগামীর প্রধান কাজ। অ্যালগোরিদমকে বর্জন করা যেমন অসম্ভব, তেমনি এর হাতে সব ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াও আত্মঘাতী। তাই ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা অবশ্যই মানুষের হাতে থাকতে হবে। যাকে বলা হয় ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’। বিশেষ করে বিচারব্যবস্থা, যুদ্ধক্ষেত্র (অস্ত্র পরিচালনা) এবং জটিল অস্ত্রোপচারের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে অ্যালগোরিদম কেবল তথ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নেবে একজন মানুষ। একে বলা হয় ‘হিউম্যান ওভারসাইট’ বা মানুষের তদারকি। যন্ত্রের যুক্তির সাথে মানুষের বিবেক ও সহানুভূতির সংমিশ্রণ ঘটানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে এমনভাবে অ্যালগোরিদম তৈরি করতে হবে যা স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক। অ্যালগোরিদম কেন কোনো একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিল, তার ব্যাখ্যা (Explainability) থাকতে হবে। বর্ণবাদ, লিঙ্গবৈষম্য বা কোনো ধরনের পক্ষপাতের ছায়া যেন কোডিং-এর ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য কঠোর নৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা জরুরি। প্রযুক্তির মালিক নয়, বরং এর নৈতিকতার নিয়ন্ত্রক হতে হবে সমাজকে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল স্বাক্ষরতা বা লিটারেসি হবে টিকে থাকার অন্যতম হাতিয়ার। মানুষকে বুঝতে হবে কীভাবে অ্যালগোরিদম তাদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলছে। যখন কোনো ব্যবহারকারী বুঝতে পারবেন যে তাকে একটি নির্দিষ্ট ‘ফিল্টার বাবল’-এর মধ্যে রাখা হচ্ছে, তখন তিনি সচেতনভাবে ভিন্ন মতের সন্ধান করতে পারবেন। অ্যালগোরিদমের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা অর্জন করাই হবে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা। আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য বা ‘ডেটা’ এখন ডিজিটাল যুগের খনিজ তেল। এই ডেটার ওপর মানুষের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। ভবিষ্যৎ আইনগুলোতে এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে কোনো কোম্পানি বা অ্যালগোরিদম মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার প্রবেশ করতে না পারে। ‘রাইট টু প্রাইভেসি’ বা গোপনীয়তার অধিকারকে ডিজিটাল জগতেও মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল তথ্য মুখস্থ না করে বরং নতুন কিছু সৃষ্টি করতে শেখে- যা কোনো অ্যালগোরিদম করতে পারবে না। মানুষের ‘অসম্পূর্ণতা’ ও ‘আবেগ’ই হবে যন্ত্রের চেয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। অ্যালগোরিদমের প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। তাই এর অপব্যবহার রোধে বিশ্বজোড়া গাইডলাইন প্রয়োজন। গভীর ফেক নিউজ (Deepfake) শনাক্ত করা, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অ্যালগোরিদমের মাধ্যমে জনমতকে ম্যানিপুলেশন করা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অ্যালগোরিদম হবে মানুষের পেশিশক্তি ও মস্তিষ্কের গতি বৃদ্ধির সহায়ক, কিন্তু মানুষের হৃদয় বা আত্মার বিকল্প নয়। আমরা যদি অ্যালগোরিদমকে আমাদের বুদ্ধিমত্তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারি এবং একই সাথে আমাদের মানবিক মূল্যবোধগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে পারি, তবেই এক সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।

পরিশেষে বলা যায়, মানুষ ও অ্যালগোরিদমের সম্পর্ক কোনো সমান্তরাল রেখা নয় যা কখনো মিলবে না; বরং এটি একটি সুনিপুণ বুনন, যেখানে যুক্তি আর আবেগ একে অপরের পরিপূরক হতে চলেছে। আমরা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে আমাদের জীবনদর্শন ও অস্তিত্বের সংজ্ঞা নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। অ্যালগোরিদম আমাদের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং অভাবনীয়ভাবে দক্ষ করে তুলেছে সত্য, কিন্তু জীবন মানে কেবল গাণিতিক দক্ষতা বা তথ্যের আদান-প্রদান নয়। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার ভুল করার ক্ষমতায়, তার আবেগে এবং তার নৈতিক বিচারবুদ্ধিতে- যা কোনো কোডিং বা অ্যালগোরিদম দিয়ে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। অ্যালগোরিদম বড়জোর একটি উৎকৃষ্ট আয়না হতে পারে যা আমাদের অতীত কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন দেখায়, কিন্তু আমাদের ভবিষ্যতের রূপকার হতে পারে না। ভবিষ্যৎ পথচলায় আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি সমাজ বিনির্মাণ করা, যেখানে প্রযুক্তি মানুষকে যান্ত্রিক করবে না, বরং মানুষকে আরও বেশি মানবিক হওয়ার অবসর দেবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, অ্যালগোরিদম যেন একটি আলোকবর্তিকা হিসেবে আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে কেড়ে না নেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গাণিতিক সূত্রের এই অরণ্যে মানুষের মৌলিকত্ব, সহমর্মিতা এবং সৃজনশীলতাই হবে আমাদের ধ্রুবতারা। মানুষ ও অ্যালগোরিদমের এই যৌথ যাত্রায় মানুষের চেতনা যেন সর্বদা চালকের আসনে আসীন থাকে- তবেই এই ডিজিটাল সভ্যতা আমাদের জন্য অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হয়ে উঠবে। একবিংশ শতাব্দীর এই চ্যালেঞ্জ জয় করে মানুষ ও যন্ত্রের এক সুসংগত সহাবস্থানই হোক আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *