ডিজিটাল ইন্ডিয়ার আনসিন মোড

সমস্যা হলো, অ্যাপ লঞ্চের পরেও সাইবার অপরাধ তো কমেইনি বরং বেড়েছে। NCRB বলছে ২০২৩ সালে সাইবার ক্রাইম কেস ৩১ শতাংশ বেড়েছে, ২০২৪-এ ইনসিডেন্টস পৌঁছেছে লাখের ঘরে, আর ২০২৫-এ প্রজেক্টেড কমপ্লেইন্টস পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। UPI স্ক্যাম, সিম-সোয়াপ, ব্যাঙ্ক ফ্রড,সব চলছে ফুল স্পিডে। রিপোর্টেড লস কয়েক লাখ, আসল ক্ষতি কয়েক হাজার কোটি। অভিযোগ করলেও সাড়া আসে স্লথের গতিতে আর গ্রামীণ এলাকায় তো নেটওয়ার্কই নেই অ্যাপ চালানোর মতো। ২০২৫-২৬ বাজেটে সাইবার সিকিউরিটির জন্য বরাদ্দ ৭৮২ কোটি, কিন্তু বাস্তবে পুরো সিস্টেমটাই যেন একটা বুলেট ট্রেন, যার লাইন বসানো হয়েছে কাঁচা রাস্তায়।

“ডিজিটাল ইন্ডিয়া” ,শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ক্যাশলেস ইউটোপিয়া, স্মার্ট সিটি, এক ক্লিকে সব সার্ভিস, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে কোথাও একটা দেশাত্মবোধক মিউজিক। কিন্তু বাস্তবটা অনেকটা এইরকম যে আপনি ভাবছেন ফোনটা আপনার, আর ফোনটা ভাবছে সে সরকারের। কেন্দ্রীয় সরকারের ডিজিটাল প্রকল্পগুলোকে বারবার উন্নয়ন আর নিরাপত্তার গল্পে মোড়া হয়, কিন্তু এই চকচকে প্যাকেজিংয়ের নিচে লুকিয়ে থাকে নাগরিকদের উপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের নেটওয়ার্ক।

এই ছবির সবচেয়ে সাম্প্রতিক পোস্টার বয় হলো সঞ্চার সাথী অ্যাপ। সরকারি ভার্সনে যেটা একেবারে ডিজিটাল সুপারহিরো। কাগজে-কলমে এটা সাইবার প্রতারণা ঠেকাবে, হারানো ফোন খুঁজে দেবে, ভুয়ো সিম ব্লক করবে, মানে অল-ইন-ওয়ান ডিজিটাল রক্ষাকবচ। কিন্তু বাস্তবে এটা অনেকটা সেই বন্ধুর মতো, যে বলে, “ভাই, আমি তোর প্রাইভেসি রেসপেক্ট করি,” তারপর আপনার ফোন হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “পাসওয়ার্ডটা কী যেন?” । সরকার এটাকে এমনভাবে প্রমোট করেছে যেন অ্যাপটা ডাউনলোড করলেই সাইবার অপরাধ নিজে থেকেই লজ্জায় ইস্তফা দেবে। বাস্তবটা? অনেক বেশি ‘ট্রাস্ট মি, ব্রো’ টাইপ।

সঞ্চার সাথীর যাত্রা শুরু ২০২৩ সালের মে মাসে, যখন ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমিউনিকেশনস এটাকে একটা ওয়েবসাইট হিসেবে চালু করে। শুরুতে কাজ ছিল সিম্পল – স্টোলেন ফোন রিপোর্ট করা। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এটাকে পুরোপুরি মোবাইল অ্যাপে আপগ্রেড করা হয়, সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় CEIR, TAFCOP আর CHAKSHU – নাম শুনে মনে হবে মার্ভেলের সিনেমার নতুন ক্যারেক্টার, কিন্তু আসলে এগুলো ফোন ব্লক, সিম চেক আর ফ্রড রিপোর্টের মডিউল। বিজেপি সরকার এটাকে এমনভাবে প্রচার করেছিল যেন এটাই ভারতের ডিজিটাল মুক্তিযুদ্ধ। তারপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে একেবারে বিগবস বিহেভিয়ার – সব নতুন স্মার্টফোনে অ্যাপ প্রি-ইনস্টল বাধ্যতামূলক, আর ডিলিট অপশন? নেই। মার্চ ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রাইভেসি অ্যাডভোকেট আর বিরোধীদের চাপে ডিসেম্বরেই অর্ডার তুলে নিতে হয়। এখন অ্যাপটা অপশনাল—কাগজে। বাস্তবে? ১৪ মিলিয়ন ডাউনলোড, সরকার বলছে ৪.২ মিলিয়ন ফোন ব্লক। সংখ্যাটা যতটা সাফল্য, ততটাই প্রচার।

সমস্যা হলো, অ্যাপ লঞ্চের পরেও সাইবার অপরাধ তো কমেইনি বরং বেড়েছে। NCRB বলছে ২০২৩ সালে সাইবার ক্রাইম কেস ৩১ শতাংশ বেড়েছে, ২০২৪-এ ইনসিডেন্টস পৌঁছেছে লাখের ঘরে, আর ২০২৫-এ প্রজেক্টেড কমপ্লেইন্টস পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। UPI স্ক্যাম, সিম-সোয়াপ, ব্যাঙ্ক ফ্রড,সব চলছে ফুল স্পিডে। রিপোর্টেড লস কয়েক লাখ, আসল ক্ষতি কয়েক হাজার কোটি। অভিযোগ করলেও সাড়া আসে স্লথের গতিতে আর গ্রামীণ এলাকায় তো নেটওয়ার্কই নেই অ্যাপ চালানোর মতো। ২০২৫-২৬ বাজেটে সাইবার সিকিউরিটির জন্য বরাদ্দ ৭৮২ কোটি, কিন্তু বাস্তবে পুরো সিস্টেমটাই যেন একটা বুলেট ট্রেন, যার লাইন বসানো হয়েছে কাঁচা রাস্তায়।

আর যে সমস্যাগুলোর সমাধান দেবে বলে সঞ্চার সাথীকে হাজির করা হয়েছে, সেই সমস্যাগুলোর জন্মই সরকারের দীর্ঘদিনের অবহেলায়। ভুয়ো সিম বছরের পর বছর বাজারে ঘুরছে, কিন্তু টেলিকম কোম্পানিগুলোর উপর কড়া নজরদারি নেই। TRAI কার্যত নিস্ক্রিয়, রেগুলেশন কেবল ফাইলেই আছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে গেলে নতুন অ্যাপ লঞ্চ করা,এইটাই হচ্ছে সরকারী রেসিপি। অথচ এই অ্যাপ আপনার IMEI, সিম ডেটা চেক করার পাশাপাশি ক্যামেরা, ফাইলস, লোকেশন, কল লগসের অ্যাক্সেস চায়। প্রাইভেসি পলিসি বলে “পার্সোনাল ডেটা কালেক্ট করা হয় না,” কিন্তু আমরা জানি যে এইটা ঠিক সেই বাক্য, যেটা বলার পরেই ডেটা কালেক্ট করা হয়।ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন একে বলছে ইউজার কন্ট্রোল কমানোর টুল,আদতে “ডিস্টোপিয়ান।” আসলে নেতাজির কথাকে অনুসরণ করেই মোদি সরকার বলছে – “তোমরা আমাকে ডেটা দাও, আমি তোমাদের রক্ষা করবো।” সমস্যা হলো, ভারতে সরকারী অ্যাপ আর “প্রটেকশন”, এই কম্বিনেশনটা এখন মিম ম্যাটেরিয়াল।

এই পুরো ছবিটা আরও পরিষ্কার হয় যখন আমরা ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট, ২০২৩-এর দিকে তাকাই। কাগজে এটা ভারতের প্রথম বড় ডেটা প্রটেকশন আইন – কনসেন্ট, ডেটা মিনিমাইজেশন, রাইট টু ইরেজার সব আছে। ২০২৫-এ ড্রাফট রুলসও এসেছে, পেনাল্টি বিশাল। কিন্তু টুইস্টটা এখানেই, গভর্নমেন্ট এক্সেম্পশন এত বেশি যে ন্যাশনাল সিকিউরিটির নামে প্রায় সবকিছুই জাস্টিফাই করা যায়। Access Now বলছে, এই আইন প্রাইভেসি বাঁচানোর বদলে স্টেট সারভেল্যান্সকে আরও শক্ত করে। GDPR-এর পাশে এটা যেন “লাইট ভার্সন” কিন্তু সরকারের পাওয়ার ফুল।

আর যদি কারও মনে হয় এসব কেবল থিওরি, তাহলে পেগাসাস স্পাইওয়্যার-এর গল্পটা মনে করলেই যথেষ্ট। সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট, বিরোধী নেতাদের ফোনে নজরদারির অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের কমিটি, রিপোর্টের পরেও কোনো ফাইনাল উত্তর নেই। ২০২৩-এ মার্কিন ফোন বিক্রেতা কোম্পানি অ্যাপল নিজেই ভারতীয় ইউজারদের সতর্ক করেছে—স্টেট-স্পন্সর্ড অ্যাটাক হতে পারে। সরকার বলেছে “ফলস অ্যালার্ম।” ২০২৬-এর রিপোর্ট বলছে ভারত ধীরে ধীরে একটা রুটিন সারভেল্যান্স স্টেটে বদলাচ্ছে। আসলে সঞ্চার সাথী আর পেগাসাস- একটা ওপেন, একটা সিক্রেট,কয়েনটা কিন্তু একটাই!

যেকোনো সার্ভিলেন্স স্টেটের উদাহরণ শুনলেই আমরা ভয় পাই যেখানে সরকারি ফোন, সরকারি অ্যাপ, সবকিছু মনিটরড। কিন্তু প্রশ্নটা অস্বস্তিকর—আমরা কি খুব আলাদা দিকে হাঁটছি? যদি কাল বলা হয়, নিরাপত্তার জন্য এই অ্যাপ বাধ্যতামূলক, তাহলে ভিন্নমত ট্র্যাক করা কতটা কঠিন হবে? ছাত্র আন্দোলন, বিরোধী রাজনীতি,সবই ডেটা পয়েন্টে পরিণত হবে। ক্যামেরা অন থাকবে, শুধু রেড লাইটটা দেখা যাবে না।

বাস্তবে সঞ্চার সাথী কোনো ডিজিটাল বিপ্লব তো নয়ই বরং এটা সরকারের অক্ষমতা, অবহেলা আর প্রচারবাজির ডিজিটাল মুখোশ। ডিপিডিপি অ্যাক্ট যেন শিল্ড, কিন্তু ভেতরে লুকোনো তলোয়ার। নিরাপত্তার নামে স্বাধীনতা ক্ষয়, প্রচারের নামে আসল সত্য ঢাকা এইটাই আজকের বাস্তব। কখনো মনে হয় আমরা যেন একটা রিয়েলিটি শোতে আছি, যেখানে ক্যামেরা সবসময় অন, আর “অপ্ট আউট” অপশনটা কেবল টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনের শেষ লাইনে,ফন্ট সাইজ ৮-এ লেখা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *