স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে রাজপথের স্পর্ধা

সৌরভ দাস

মার্কস যেমন বলেছিলেন, “শ্রম বন্ধ হলে পুঁজি মৃত হয়ে পড়ে” এই ধর্মঘট ঠিক সেই সত্যটিই প্রমাণ করেছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্থবিরতা আসার ফলে গিগ শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে জাতীয় স্তরে জনমত তৈরি হয়। ধর্মঘটের প্রবল চাপে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের দীর্ঘদিনের অনমনীয় অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। রাজস্থান সরকার ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে গিগ শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা দিতে বিশেষ আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনের অধীনে একটি ‘ওয়েলফেয়ার বোর্ড’ গঠিত হয়েছে এবং প্রতিটি ট্রানজ্যাকশনের ওপর ভিত্তি করে একটি সামাজিক সুরক্ষা তহবিল তৈরির বিধান রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ‘সোশ্যাল সিকিউরিটি কোড-২০২০’-এর মাধ্যমে গিগ শ্রমিকদের আইনি সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

ভারতজুড়ে গিগ শ্রমিকদের সাম্প্রতিক ধর্মঘট বর্তমান ডিজিটাল অর্থনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড়। ফুড ডেলিভারি থেকে শুরু করে রাইড শেয়ারিং অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক যখন রাজপথে নেমে আসেন, তখন তা কেবল পারিশ্রমিক বৃদ্ধির দাবি থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে আধুনিক পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত শ্রেণিসংগ্রাম। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধর্মঘট ছিল ‘সর্বহারা’র অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।এই ধর্মঘটের মূলে ছিল কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের কাঠামোগত শোষণ। ভারতের গিগ শ্রমিকরা মূলত কাজ করেন ওলা, উবের জোম্যাটো, সুইগি এবং ব্লিনকিটের মতো প্ল্যাটফর্মে।

কোম্পানিগুলো তাদের ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে ‘পার্টনার’ বলে অভিহিত করে, যার ফলে তারা ন্যূনতম মজুরি, বিমা বা পেনশনের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে যখন তাদের প্রকৃত আয় তলানিতে এসে ঠেকেছে, তখনই অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে খামখেয়ালিভাবে কাজের রেট কমিয়ে দেওয়া এবং অমানবিক ‘টার্গেট’ পূরণের চাপ শ্রমিকদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছিল।আন্দোলনের অভিনব কৌশল ও প্রভাবধর্মঘটের কৌশলটি ছিল অত্যন্ত অভিনব। শ্রমিকরা কেবল রাজপথে মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তারা সম্মিলিতভাবে অ্যাপ থেকে ‘লগ-আউট’ করে ডিজিটাল ব্যবস্থাকে অচল করে দেয়। দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু এবং কলকাতার মতো বড় শহরগুলোতে যখন ২৪ ঘন্টার জন্য এই পরিষেবাগুলো স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন পুঁজিবাদী কাঠামোর ভঙ্গুরতা প্রকট হয়ে ওঠে। মার্কস যেমন বলেছিলেন, “শ্রম বন্ধ হলে পুঁজি মৃত হয়ে পড়ে” এই ধর্মঘট ঠিক সেই সত্যটিই প্রমাণ করেছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্থবিরতা আসার ফলে গিগ শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে জাতীয় স্তরে জনমত তৈরি হয়। ধর্মঘটের প্রবল চাপে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের দীর্ঘদিনের অনমনীয় অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। রাজস্থান সরকার ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে গিগ শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা দিতে বিশেষ আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনের অধীনে একটি ‘ওয়েলফেয়ার বোর্ড’ গঠিত হয়েছে এবং প্রতিটি ট্রানজ্যাকশনের ওপর ভিত্তি করে একটি সামাজিক সুরক্ষা তহবিল তৈরির বিধান রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ‘সোশ্যাল সিকিউরিটি কোড-২০২০’-এর মাধ্যমে গিগ শ্রমিকদের আইনি সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এছাড়া ‘ই-শ্রম’ (e-Shram) পোর্টালের মাধ্যমে তাদের নিবন্ধীকরণ বাধ্যতামূলক করে দুর্ঘটনা বিমা ও মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং দশ মিনিটে ডেলিভারি করতে হবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।যদিও এই পরিবর্তনগুলো এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি তবুও এটি অনস্বীকার্য যে গিগ শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ লড়াই রাষ্ট্রশক্তিকে তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করতে বাধ্য করেছে।আন্দোলনের অর্জন ও ভবিষ্যৎএই লড়াইয়ের ফলাফল হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন চোখে পড়ার মতো। প্রথমত, এটি শ্রমিকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব ‘শ্রেণি-চেতনা’ জাগ্রত করেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা শ্রমিকরা আজ ইউনিয়নের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ। দ্বিতীয়ত, অনেক কোম্পানি চাপের মুখে পড়ে তাদের পে-আউট কাঠামো সংস্কার এবং শ্রমিকদের জন্য কিছু কল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করতে বাধ্য হয়েছে। ভারতের গিগ শ্রমিকদের এই ধর্মঘট পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতরেই তার বিরোধীদের শক্তিশালী হওয়ার প্রমাণ। যদিও কোম্পানিগুলো এখনও আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে শোষণ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তবুও এই আন্দোলন শ্রমিক শ্রেণিকে এক নতুন পরিচয় দিয়েছে। এটি কেবল মজুরি বৃদ্ধির লড়াই ছিল না, বরং ডিজিটাল শৃঙ্খল ভেঙে মানবিক মর্যাদা ও শ্রমের ন্যায্য মূল্য ছিনিয়ে নেওয়ার এক দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের সূচনা মাত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *