ছাত্র সমাজের দায়িত্ব – (ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির উদ্যোগে ১৯৮৫-র ২৮ এপ্রিল ব্যারাকপুরে অনুষ্ঠিত রাজ্য ছাত্র কনভেনশনের প্রকাশ্য সমাবেশে বক্তৃতা)

প্রশ্নটা এটা নয়, শতকরা কতভাগকে আমি শিক্ষিত করবো? কতভাগকে আমি চাকরি দেবো? এটা তো কোনো কথা না, কারণ, এটা যতদিন থাকবে, ততদিন এই মারামারি-হানাহানি থাকবে। এইখানেই আমাদের মতাদর্শগত সংগ্রাম দরকার। ভাবাদর্শেই লড়াই আমাদের দরকার এবং এটা কে করবে? আমরা রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের যে কর্তব্য, সেটা তো পালন করবো। কিন্তু পাশাপাশি ছাত্র সমাজেরও একটা বিশেষ দায়িত্ব এখানে এসে গেছে। যেমন, শ্রমিক শ্রেণীর দায়িত্ব আছে, ছাত্র সমাজেরও একটা দায়িত্ব আছে। তাদের সুযোগ আছে, সুবিধে আছে। তারা বুঝতে পারেন, তাদের লেখাপড়া করবার সুযোগ আছে। সেই দিক থেকে তারা বোঝাতে পারেন আরও দশজন মানুষকে যে “কোথায় আমরা আছি? স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর ৬টা পরিকল্পনার পরেও কেন এই অবনতি?” কাজেই এটা একটা ভাবাদর্শের লড়াই।

কমরেড সভাপতি এবং ছাত্রছাত্রীগণ, আপনারা জানেন আমি এখানে এসেছি দুটো কারণের জন্য। ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের যে কনভেনশন আপনারা করলেন, তাকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি এবং সংক্ষেপে কয়েকটি কথা আমি বলবো। রিপোর্টে আপনারা আলোচনা করেছেন এবং আমি বক্তৃতাও শুনলাম। আমি সাধারণভাবে দু-একটি কথা বলতে চাই। স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা লক্ষ্য করছি শাসক গোষ্ঠী এসব প্রচার করবার চেষ্টা করছে প্রতিনিয়ত যে, ছাত্রদের এখন আর রাজনীতি করার প্রয়োজন নেই এবং দুর্ভাগ্যবশত অভিভাকদের মধ্যেও অনেকে এটা মনে করেন যে সেই দিনগুলো শেষ হয়ে গেছে। তখন ছাত্রদের আন্দোলনের মধ্যে আসতে হতো, সংগ্রামে আসতে হতো, ব্রিটিশ বিরোধী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই তাদের করতে হতো, কারণ কংগ্রেস থেকে ওরা ডাক দিতেন সেই সময় ছাত্রসমাজকে, ডাক দিতেন যুব সমাজকে। এমনও কথা হয়েছে যে, “এখন কলেজ ছেড়ে চলে এসো। এখন আর পড়াশুনার কথা নয়, এখন দেশকে মুক্ত করার কথা, স্বাধীন করার কথা। কিন্তু, পরবর্তীকালে আমরা দেখলাম, এরকম একটা ভাবধারা ছড়ানোর চেষ্টা হলো, মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হলো যে, এখন তো সব হয়ে গেছে, স্বাধীন আমরা হয়ে গেছি! কাজেই এখন আর রাজনীতি করে কী হবে?

আমরা যারা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী, আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ছাত্রসমাজের এখন কি কর্তব্য, সেটা আমরা দেখি না, এটা নিশ্চয়ই জানা আছে। এমনটা হলে তো খুব ভালোই হতো, “আমাদের আমরা এখন দেশ মুক্ত হয়েছে। সমাজবাদে পৌঁছে গিয়েছি, আমরা এখন আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছি এবং এখন দেশ গঠনের কাজ করতে হবে, ব্যাপক সব ব্যবস্থা করতে হবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, আমরা যেটুকু পিছিয়ে আছি, তার থেকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কাজেই এখন আন্দোলন সংগ্রাম, জেলে যাওয়া, আইন ভাঙ্গা এসবের কোনপ্রশ্নই এখানে ওঠে না।” কিন্তু, সেই অবস্থা তো হয়নি, এতো খুব সহজ কথা! আমরা যখন স্বাধীনতা পেলাম আর আজ অবধি ৩৭ বছর হলো, সেখানে একটা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সামন্ততন্ত্রের সাথে আপোষ করে গড়ে তুলবার চেষ্টা হচ্ছে। ৬টা পরিকল্পনা শেষ হয়েছে, সপ্তম পরিকল্পনা শুরু হয়েছে এবং আমাদের এখন অতটা হয়তো মানুষকে বোঝাতে হয় না, যেটা প্রথম এবং দ্বিতীয় পরিকল্পনার সময় বোঝাতে হতো। কারণ তখন অনেক সুযোগ খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন তো আর অত করে বোঝাতে হবে না পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কারণ মানুষ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে, যে সমাজ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চলছে আর যে সামন্ততন্ত্রের মধ্যেও আমরা এখনও ভারতের বহু জায়গায় আছি, ফলে যতই পরিকল্পনা হোক না কেন, বাস্তবায়ন হয়নি।
পরিকল্পনায় যে কিছুই হয়নি, এটা তো কোনো কথা না, অনেক কলকারখানা হয়েছে, শিল্প গড়ে উঠেছে, এসব আমরা দেখতে পাচ্ছি। সাথে সাথে এটাও আমরা দেখছি, সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষ কিছুই হয়নি। ওপরতলার নিচুতলার প্রভেদ বেড়েছে এবং এক একটা পরিকল্পনার পর বেকারও বাড়ছে। বেকারের কোনো হিসেব নেই আমাদের দেশে, কিন্তু ওই যে রেজিস্ট্রিকৃত বেকার যে নাম লেখায় চাকরির জন্য, সেখান থেকেও বুঝতে পারছি যে বেকারত্ব বাড়ছে। তাছাড়া গ্রামে তো কোনো হিসেব নেই। বেকারে বেকারে দেশটা ভরে গেল। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সত্যিই কোনো পরিকল্পনা হতে পারে না। এক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিকল্পনা হয়েছে- হতে পারে। কিন্তু ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তবুও ওরা করছেন সেটা। করে কিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনেছেন, কিছু করছেন। যা ব্যক্তিগত মালিকানা আছে, যা বেসরকারী অংশ আছে, সরকার তাদের বলছেন, “তোমাদেরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে”। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব একটা আছে, যৌথ একটা আছে, এসব আমরা জানি। কিন্তু আমরা দেখছি, ফলাফল দেখে তো মানুষ বিচার করবে। বিচার করবে যে, মানুষের রোজগার বাড়ছে না, জিনিসের দাম বাড়ছে, বেকার বাড়ছে, কর্মহীন হয়ে যাচ্ছে মানুষ। এমনকি কলকারখানা যেগুলো হয়েছিল, সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার কলকারখানা ছোটো বড়ো মাঝারি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এইসব যষ্ঠ পরিকল্পনার সময়ও দেখেছি। কাজেই মানুষ এটা বুঝতে পারছেন, তাদের মনে সন্দেহ হচ্ছে এখন যে, “কি তাহলে হয়েছে? হচ্ছে না তো”। গ্রামের যেখানে ৭০-৮০ ভাগ মানুষ বাস করেন, তারাও দেখছেন তাদের দারিদ্র ঘুঁচছে না। এ তো ভয়ঙ্কর অভিশাপ…আমাদের দারিদ্র্য-বেকারত্ব, এটা মানুষ দেখছেন চোখের সামনে। নিরক্ষরতা? অন্তত এটা তো সরকারের দূর করার কথা ছিল। এই সমাজব্যবস্থায়, এই অর্থনীতিতে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম আমরা, সম্পূর্ণভাবে সফল না হলেও। কিন্তু কোথায় পড়ে আছি? ৬০ ভাগ মানুষ ভারতবর্ষে এখনও নিরক্ষর। সে বিষয়ে ব্যবস্থা এখনও কিছু করা যায়নি। তারপর শিক্ষিত বেকার, এমনকি টেকনিক্যাল শিক্ষিত বেকার। কারিগরী শিক্ষা যারা পেয়েছেন, বেকার তার মধ্যেও আমরা দেখছি। কাজেই আমরা এটা মনে করছি, এগুলো তো দূর করতে হবে আমাদের। এগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। তা হলে রাজনৈতিক দল যারা আছে প্রগতিশীল আর বিশেষ করে মার্কসবাদী রাজনৈতিক দল যারা আছে, এইসব লক্ষ্য রেখে তো তাদের চলতে হবে। সেজন্য আমরা বলি, আমূল পরিবর্তন যদি না হয়,কোনো সমাধান হবে না। ছিটেফোঁটা কিছু হবে ঠিকমতো কাজ করলে, কিন্তু আমূল সংস্কার যদি না হয় তাহলে এই যে বিরাট সমস্যা তা তো দূর হবে না। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক সমস্যা, সামাজিক দিক থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। ভারতবর্ষের বহু অঞ্চলে, বহু এলাকায়, বহু প্রদেশে… সেখানে এখনও বহু মানুষ অচ্ছুত, তাদের সাথে এখনও সমাজের কোনো সামাজিক লেনদেন নেই, সামাজিক কোনো মেলামেশা নেই, এইভাবে তাদের একঘরে করে রাখা হচ্ছে। কতগুলো রাজ্যে গেলে দেখা যাবে যাদের বলা হয় তপশিলী জাতি-উপজাতি, তাদের বাকিদের থেকে আলাদা বসবাস। পশ্চিমবঙ্গেও আছে কিছু, কিন্তু ততটা নয়। আলাদা বসবাস। এগুলো চলছে। এবং সে জন্য এর ফলস্বরূপ দুটো জিনিস হচ্ছে আমরা দেখছি। এক, মানুষ বুঝতে পারছে যে এটাকে ভাঙতে হবে, আমূল পরিবর্তন করতে হবে, এছাড়া কোনো পথ নেই। আবার অন্য আর একটি দিক আছে সেটা ভুললে চলবে না। পিছিয়ে পড়লে যা হয়, নিজেদের মধ্যে হানাহানি- মারামারি। চাকরিতে সংরক্ষণ, এই নিয়ে মারামারি লেগে যাচ্ছে।

এমন অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে যে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যেও
ভাগ করে দিচ্ছে, মানুষকে স্বার্থপর করে তুলছে। বলছে যে, “বাবা, অত ভেবে কি হবে? নিজেদের ছেলেমেয়েদের চাকরি হলেই হবে”… এই অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে। কটা চাকরি আছে? কোথায় চাকরি হবে? ভূমিসংস্কার যদি করতে না পারি, যদি আমরা কৃষি ব্যবস্থা না করতে পারি, যে ৭০ ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করেন, তারা চাকরিটা কোথায় পাবেন? সরকারী চাকরি কটা হচ্ছে? কলকারখানা কটা হচ্ছে, যে সেখানে চাকরি হবে? তবু এই নিয়ে একটা হানাহানি-মারামারি গুজরাটের মতো জায়গায়। আমরা অন্ধ্রে দেখেছিলাম, তেলেঙ্গানার একটা অংশ আর তেলেঙ্গানার বাইরে একটা অংশ কে চাকরি পাবে? তেলেঙ্গানার লোক না বাইরের লোক? এই নিয়ে একটা মারামারি লেগে গেল। আগুন জ্বলছে, মানুষ মরছে, পুলিশ- মিলিটারী আসছে, এসব দেখলাম আমরা কিছুদিন আগে। এবং সমস্তটা আমরা যদি দেখি, আসামে-পাঞ্জাবে এখন যা বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হচ্ছে, সবেরই একটা উৎস না, একটা কারণ না। কিন্তু, এটাই একটা বাস্তব কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি আমাদের ট্রেড ইউনিয়নকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এর মধ্যে আবার দু’রকম আছে। যারা পিছিয়ে পড়া মানুষ এবং আরেকরকম আছে, যাদের সংবিধানের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু অধিকার আছে, সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে তাদের জন্য…ঐ তফসিলী জাতি-উপজাতি। আবার তার সাথে জড়িয়ে গেছে ঐ যাদের ‘ব্যাকওয়ার্ড’ বলা হয়। এরপর ব্রাহ্মণরাও বলতে পারে, “আমরা পিছিয়ে পড়া”। কারণ এটা যদি চাকরির সাথে জড়িয়ে যায়, তবে সবাই বলবে। এইসব করে ওদের আলাদা ইউনিয়ন করবার জন্য, প্রতিক্রিয়াশীলরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। সুবিধে হলো তাহলে মালিকদের সাথে আর লড়াই হবে না; নিজেদের মধ্যে মারামারি হবে। এবং আমরা বলছি না যে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই, এখনও কিছু কিছু প্রয়োজন আছে, সংবিধানেও তা আছে। কিন্তু এই সংরক্ষণ ১০ বছর থাকবার কথা ছিল, কিন্তু অনেকদিন হয়ে গেল, কিছু কী হয়েছে? হয়নি তো। যাদের আমরা ভেবেছিলাম টেনে নিয়ে আসব, আনতে পারিনি। আমূল পরিবর্তন আমরা করতে পারিনি। অর্থনীতিটাকে যেভাবে বদলে দেবার দরকার ছিল, তা হয়নি। সমাজতন্ত্রের দিকে আমরা যেতে পারিনি। কংগ্রেসী সমাজতন্ত্র নয়, যে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা আমরা বলি। প্রশ্নটা হচ্ছে সবার চাকরি, প্রশ্নটা হচ্ছে সবার শিক্ষা…

প্রশ্নটা এটা নয়, শতকরা কতভাগকে আমি শিক্ষিত করবো? কতভাগকে আমি চাকরি দেবো? এটা তো কোনো কথা না, কারণ, এটা যতদিন থাকবে, ততদিন এই মারামারি-হানাহানি থাকবে। এইখানেই আমাদের মতাদর্শগত সংগ্রাম দরকার। ভাবাদর্শেই লড়াই আমাদের দরকার এবং এটা কে করবে? আমরা রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের যে কর্তব্য, সেটা তো পালন করবো। কিন্তু পাশাপাশি ছাত্র সমাজেরও একটা বিশেষ দায়িত্ব এখানে এসে গেছে। যেমন, শ্রমিক শ্রেণীর দায়িত্ব আছে, ছাত্র সমাজেরও একটা দায়িত্ব আছে। তাদের সুযোগ আছে, সুবিধে আছে। তারা বুঝতে পারেন, তাদের লেখাপড়া করবার সুযোগ আছে। সেই দিক থেকে তারা বোঝাতে পারেন আরও দশজন মানুষকে যে “কোথায় আমরা আছি? স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর ৬টা পরিকল্পনার পরেও কেন এই অবনতি?” কাজেই এটা একটা ভাবাদর্শের লড়াই। কলেজে-কলেজে, সংসদে-সংসদে ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বকে এই কাজ করতে হবে। নিজের জায়গায় এবং অন্য জায়গায়, অন্য আন্দোলনে থেকেও। আর এখানেই রাজনীতির কথা আসে। ছাত্রদের কথা বলতে হবে লেখাপড়া করে। অল্পসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর যে সুযোগ আছে, আমরা তাদের বলবো, “যতটুকু সুযোগ আছে পড়ো এবং বুঝে নাও”। এ সুযোগ ভারতবর্ষের প্রত্যেকের নেই। তাই যেটা পাওয়া গেছে, সেই সুযোগ ভালো করে গ্রহণ করতে হবে। যারা বিজ্ঞান পড়ছে, কলা বা অন্য বিভাগে আছে, তাদের ভালো করে বুঝে নিতে হবে। বুঝে নেওয়াটা শুধুমাত্র পরিবারের জন্য বা নিজের জন্য নয়। এই জন্য যে, আমরা এগুলো প্রয়োগ করতে পারি কিনা দেশের জন্য, দেশের মুক্তির জন্য।

এটা আমাদের দেখতে হবে, আমরা আমাদের জ্ঞান দিয়ে মানুষকে বোঝাতে পারছি কিনা। আমরা যে শিক্ষা-দীক্ষা আহরণ করছি বিভিন্ন বই-পুস্তক থেকে, আন্দোলন থেকে, সেগুলো বোঝাতে পারছি কিনা। ছাত্র সমাজের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিরাট সুযোগ ছিল, অল্পসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ছিল, যারা সে সুযোগ গ্রহণও করেছেন। এইটা আমরা দেখেছি বিভিন্ন আন্দোলনে। কারণ, তখন স্বাধীনতা আন্দোলন! আমাদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে তাড়াতে হবে, দেশকে মুক্ত করতে হবে। কিন্তু দেশকে কিসের জন্য মুক্ত করবো? শুধুমাত্র ব্রিটিশকে তাড়াবার জন্য? তা তো নয়।
তখন ভাবা হয়েছে, এমনকি কংগ্রেসের ভেতরেও প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে যে, আমাদের কি ধরনের ভবিষ্যত হবে! জগদ্দল পাথরের মতন আমাদের উপর বসে আছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। সেটাকে সরিয়ে দেবার পর আমরা মুক্ত হব, মুক্ত হয়ে কী ধরনের সরকার হবে, কী ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা আমরা করতে চাই, কী ধরনের অর্থনীতি আমরা করতে চাই , কী সমাজনীতি গ্রহণ করতে চাই? ভারতবর্ষে অনেক জায়গায় আমরা যে পিছিয়ে পড়ে আছি সেগুলো কী করে আমরা দূর করবো? শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, সামাজিক সংস্কারও আমাদের সামনে ছিল। সেজন্যই আমি বলছি, এখন এসব তো ভুলিয়ে দিলে চলবে না ছাত্র সমাজকে, রাজনীতি দরকার, ভীষণভাবে দরকার। কি ধরনের সরকার হবে, কি ধরনের রাষ্ট্র হবে, কি ধরনের অর্থনীতি হবে? এগুলো তো রাজনীতির অংশ। ছাত্রদের তো এটা বুঝতে হবে যে, “লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছি, এরপরে কি হবে? কয়েক বছর পর পাশ করে যাবো, পড়াশুনা শেষ হয়ে যাবে, তারপর কি হবে?” যারা ছাত্র সমাজের অগ্রণী অংশ, আমাদের সমাজ পরিবর্তনের জন্য তাদের লড়াই করতে হবে, নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদেরও টেনে আনতে হবে। আমরা যদি এগুলো না করি, না বোঝাই, লড়াই যদি আমরা না করি যেখানে প্রয়োজন আছে, প্রতিক্রিয়াশীলরা ওদের টেনে নিয়ে যাবে। প্রতিক্রিয়াশীলরা তাদের ভাবাদর্শ দিয়ে ওই হিন্দু-মুসলমান-ক্রিশ্চান বিভিন্নরকম বলে, নানারকম স্লোগান দিয়ে ছাত্রদের বিপথে পরিচালিত করবে, যা বিভিন্ন জায়গায় ভারতবর্ষে ইতিমধ্যেই হয়েছে। আমরা এখনও দেখছি কলেজ নির্বাচনে ভারতবর্ষে বিভিন্ন জায়গায় ঐ জাতপাতের কথা আসছে। বড়োদের মধ্যে এই ভাবনা থাকে,সেটা বোঝা যায়। কিন্তু দুঃখের কথা, ছাত্রদের মধ্যেও এই ভাবনা আছে। আর তার থেকে যদি আমরা ছাত্র সমাজকে মুক্ত করতে না পারি, তবে আমরা যে লক্ষ্যে পৌঁছবার কথা বলছি, সেটা তো সম্ভব হবে না। সেইদিক থেকে আমাদের অনেক কাজ বাকি। ছাত্রদের আর একটা বিরাট ভূমিকা আছে প্রচারের ব্যাপারে, শুধুমাত্র নিজেদের বন্ধু বান্ধব নয়, আশেপাশের ছাত্র-ছাত্রী নয়, সমস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে, প্রচারের মাধ্যমকে যতটুকু ব্যবহারের সুযোগ আছে, তাকে কাজে লাগিয়ে। প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রচারের আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার সাথে সাথে অনেক রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠে যায়, তার জবাব দিতে হবে। কেন্দ্রের সরকারের হাতে এতো হাতিয়ার আছে মানুষকে বিভ্রান্ত করবার জন্য, সেটা তো আমরা দেখছি। যে সমস্ত সংবাদপত্র আমাদের দেশে আছে, তারা বুর্জোয়া সংবাদপত্র। তারা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করবার জন্য। কখনো সরাসরি কখনো অস্পষ্টভাবে। এতে আমাদের লোকরাও কখনো কখনো বিশ্বাস করে যান। জার্মানিতে হিটলারের একটা কায়দা ছিল, মিথ্যাকে বড়ো করে দেখাও, বারবার বলো, তাহলে সরল মানুষ এক সময় বিশ্বাস করবেই। আমাদের দেশও এর থেকে মুক্ত নয়। যত বেশি কাগজ বেরোচ্ছে, তত আমাদের শত্রু বাড়ছে। এরপর রেডিও আছে, তাতে প্রতিনিয়ত শহরে গ্রামে পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। টেলিভিশন আছে, এদের যে বিরাট ভূমিকা মানুষকে বিপথে চালিত করবার তা আমরা দেখেছি গত লোকসভা নির্বাচনে। এসবের বিরুদ্ধে মানুষকে বুঝিয়ে সচেতন করতে হবে। এ ব্যাপারে ছাত্ররা অনেক সাহায্য করতে পারেন। না হলে তো ওই হিন্দু মহাসভা, বিজেপি ছাত্রদের নিয়ে চলে যাবে, ওদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করবে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের।

এর ফলে দুঃখজনকভাবে মহারাষ্ট্রে বোম্বাই-র মতো জায়গায় পৌর নির্বাচনে জিতেছে শিবসেনার মতো দল, যারা বলে ‘মহারাষ্ট্র মারাঠিদের জন্য’। আমাদের এখানেও ‘আমরা বাঙালি’ বলে একটা সংগঠন গড়ে উঠেছে। তাহলে দেশটা কোথায় যাবে? মারামারি-হানাহানিতে ভারতবর্ষ টুকরো হয়ে যাবে? এটাতো আমরা হতে দিতে পারি না। তাই অভিভাবকদের কাছে যেতে হবে, যারা বলেন ছাত্ররা রাজনীতি করবে না। তাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, দেশের এই সব সমস্যায় ছাত্ররা কী করবে? তারা কি চুপচাপ বসে থাকবে? পাঞ্জাবে আমাদের ছাত্র ফেডারেশন যারা আছে ওই ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যেও তারা লড়াই করে যাচ্ছে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে, কিন্তু ওই শিখ ছাত্র ফেডারেশন যেটা আছে, তারা তো সব উগ্রপন্থী হয়ে গেছে। খালিস্তানি শ্লোগান দিচ্ছে মার্কিনি বিদেশী মদতে। আসামেও সেই এক জিনিস, ছাত্র-সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করে দিচ্ছে। এগুলো তো রাজনীতি! এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য ছাত্রদের রাজনীতি জানতে হবে, প্রগতিশীল রাজনীতি। আমরা বলি, ছাত্রদের মার্কসবাদ পড়তে হবে, জানতে হবে। রাজীব বলছেন, মার্কসবাদ পড়াবার জন্য নাকি পশ্চিমবঙ্গ গোল্লায় যাচ্ছে, কিন্তু এটা ওনার জানা উচিত ছিল বিশ্বের সমস্ত প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কসবাদ পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত। বুর্জোয়া দর্শন পড়ানো হবে আর মার্কসবাদ জানবে না, এটা হয় কি? হয় না। ফ্যাসিবিরোধী সপ্তাহ, ফ্যাসিবাদের উত্থান পতন অনেক মানুষ জানেন না, তাদের বোঝাতে হবে। ফ্যাসিবাদের যে বিপদ, তা তো নির্মূল হয়ে যায়নি। এইবারের নির্বাচনে ওরা বিভিন্ন কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করলো, “বন্ধ কলকারখানা খুলে দেবো”,যুবক প্রধানমন্ত্রী এইসব বলল। অনেক শিক্ষিত মানুষও ভুল বুঝেছেন। তাই আমাদের অনেক কঠিন পথ দিয়ে যেতে হবে। ছাত্ররা সেটা করছেনও। আসামে ওরা কঠিন লড়াই করছেন বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে।

পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার জনগণের সরকার। অনেক লড়াই আন্দোলনের ফলশ্রুতি এই সরকার। তাই আমাদের পরিষ্কার বুঝে নিতে হবে এই সরকারের কাজ, সীমাবদ্ধতা। কেননা মানুষকে তো আমরা মিথ্যে বলতে পারবো না, ওটা বুর্জোয়া পার্টিরা করে। মানুষকে ওরা বলছেন, এখানে তো বামফ্রন্ট সরকার, তবে কেন ছেলেদের চাকরি হচ্ছে না? তাই জনসাধারণের কাছে আমাদের বলতে হবে, যে এই অবস্থার চাকরি হওয়া অসম্ভব, যদি কেন্দ্রীয় সরকার সেই ব্যবস্থা না করে। পরিকল্পনা কারা করেন? কেন্দ্রীয় সরকার-যোজনা পর্যদ…এরা। এরাই তো ঠিক করেন, কোথায় কত টাকা দেওয়া হবে, কোথায় কটা কারখানা হবে। আমরা রাজ্য সরকার শুধুমাত্র সেই সিদ্ধান্তগুলি কার্যকর করার চেষ্টা করি। বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি এই সমস্ত প্রশ্নে আমরা যদি সঠিক বক্তব্য মানুষের কাছে তুলে ধরতে না পারি, তবে ওরা মানুষকে সাময়িক বিপথে চালিত করতে পারবে। এইবারের কেন্দ্রীয় বাজেটে একটা ভয়ংকর গতি নির্দেশ করছে। কর্মনিয়োগ বন্ধ। তাই সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে আমাদের মানুষকে সংগঠিত করতে হবে, মানুষকে বোঝাতে হবে। রাজনীতির বাইরে যারা আছেন, তাদেরকে, এমনকি বুর্জোয়া পার্টির সাথে আছেন এমন মানুষকেও বোঝাতে হবে। কেননা ওদেরকে তো আমরা একদম আলাদা করে দিতে পারি না, তাহলে আমরা এত বড়ো হতাম না। ক্ষুদ্র একটা অংশ ছিলাম, আমরা এত বড়ো হয়েছি ওদের থেকে অনেক মানুষ বেরিয়ে এসেছে বলেই। বারে বারে মানুষের কাছে যেতে হবে তাদেরকে শিক্ষিত করতে। সম্প্রতি তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে জিতেছি আমরা, এটা খুব ভালো হয়েছে। বিশ্বভারতীতেও আমরা সামনের সারিতে, খুবই আনন্দের কথা। সাথে সাথে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের আমাদের সংগঠিত করতে হবে পাড়ায়-পাড়ায়, জেলায়-জেলায়। তাঁদের নিয়ে যেতে হবে খেলাধূলার জায়গায়, স্টেডিয়ামে। জেলায় জেলায় স্পোর্টস্ কাউন্সিল হয়েছে, এসব আমাদের করতে হবে। আর এসব করতে হলে সংগঠনকে মজবুত ও শক্তিশালী করতে সদস্য সংখ্যা বাড়াতে হবে। ছাত্রীদের মধ্যেও চেতনা বাড়ছে, তাদেরকে সংগঠিত করতে হবে। আন্দোলন করতে হবে। অনেকে বলেন, “সরকার যখন আছে, তখন আন্দোলনের কী দরকার?” কিন্তু আমরা আইন করে দিলেই তো হবে না, দেখতে হবে যাতে সেগুলো কার্যকরী হয়। তা না হলে আন্দোলন করতে হবে। কেননা আমরা তো বিপ্লব করে আসিনি, এই ব্যবস্থায় এক ছোটো রাজ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছি। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক কী? অর্থ কমিশন কী? এ সমস্ত ছাত্রদের বুঝতে হবে, না হলে তারা গ্রামের মানুষকে কি বোঝাবেন? অর্থ কমিশনের মঞ্জুরীকৃত টাকা কেন্দ্রীয় সরকার দিলেন না, এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে। আমাদের ন্যায্য পাওনা দিলেন না, পেট্রো-কেমিক্যাল দিলেন না টাকার কথা বলে, ইলেকট্রনিক্স হলো না। এ সমস্ত কথা প্রতিনিয়ত আমাদের বোঝাতে হবে। এসব কথা বলতে গিয়ে আমাদের খুব সাবধান থাকতে হবে, প্রাদেশিকতা আমাদের মধ্যে যেন দানা না বাঁধে। মিথ্যের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে, সত্যটা সব সময় বলতে হবে। আর আমাদের আন্দোলন হবে সংগঠিত। মানুষ আমাদের এখন দেখে শাসক পার্টি হিসাবে। সেজন্য আমাদের মানুষের সাথে ব্যবহারটা খুব ভালো রাখতে হবে, ভদ্র ব্যবহার করতে হবে, সংযত হতে হবে। এটা যেন মানুষ বুঝতে পারেন, কংগ্রেসী ছেলেদের সাথে আমাদের অনেক তফাৎ আছে। আর একটা জিনিস, ভাগা-ভাগিটা করবেন না, ওদের সঙ্গে যারা আছেন তাদের বুঝিয়ে টেনে নিয়ে আসতে হবে। ধৈর্য ধরে তাদের বোঝাতে হবে, তাদের কাছে টেনে নিয়ে আসতে হবে। আর ক্লাবগুলোর দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। বেশির ভাগ ক্লাবগুলো কংগ্রেসের ঘাঁটি। কিন্তু অনেক ভালো ছেলে আছে, যারা খেলাধূলা করেন, তাদের টেনে আনতে হবে। আর সমস্ত কিছু নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে বিচার করলে চলবে না। এটা আনন্দের বিষয় এখন সারা রাজ্যে এস এফ আই নেই, এমন কোনো জায়গা নেই। কিছু কলেজে ওরা জিতেছে, তাতে ভেঙে পড়লে চলবে না। সে জায়গাটা আমাদের ধরতে হবে, বিশ্লেষণ করে ত্রুটি বিচ্যুতি কাটিয়ে উঠতে হবে। ভালো ছাত্রদের আমাদের দিকে নিয়ে আসতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *