ম্যারাডোনা: বলের বুকে বিদ্রোহের শিল্প

“হ্যান্ড অব গড” শুধু একটা গোল নয়—তা ছিল নিপীড়িতের নীরব প্রতিশোধ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের গোলটি অনেক আর্জেন্টাইন-ই দেখেছিল ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে। ম্যারাডোনা নিজেও পরে বলেছিলেন, সেটি ছিল “একটু মাথা, একটু ঈশ্বর” — কিন্তু আবেগগতভাবে এটি রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ নেয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছায়া যেখানে ঘুরে বেড়াত, সেখানে দরিদ্র আর্জেন্টাইন ছেলেটি ঈশ্বরের হাত হয়ে ন্যায়ের ভারসাম্য ফিরিয়ে দিয়েছিল। তিনি জানতেন, ফুটবল কেবল খেলা নয়—এটি শ্রেণির, রাজনীতির, এবং মর্যাদার সংগ্রাম।

ফুটবল, বিপ্লব আর ম্যারাডোনা – এ এক অমর ভালোবাসার গল্প। দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা ছিলেন বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে এক বর্ণাঢ্য চরিত্র এবং একটি মহাবিস্ময়। তিনি কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি ছিলেন এক শিল্পী, যিনি বলকে তুলির মতো ব্যবহার করে আঁকতেন জনতার স্বপ্ন। তাঁর ড্রিবল ছিল নৃত্য, তাঁর স্পর্শ ছিল সঙ্গীত, আর তাঁর গোল ছিল এক মুহূর্তের মুক্তি—দরিদ্রের, বঞ্চিতের, প্রান্তিক মানুষের মুক্তি। ফুটবল জাদুকর দিয়েগো ম্যারাডোনার খেলাকে বলা হতো মাঠের কবিতা। বুয়েনস এইরেস এর গলি থেকে উঠে আসা ১০ নম্বর জার্সি পরা ছেলেটার উত্থানই অবশ্য কবিতার মতো। ম্যারাডোনার জন্ম ৩০ অক্টোবর ১৯৬০, আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের উপকণ্ঠে ভিল্লা ফিওরিতো নামের এক দরিদ্র এলাকায়। তাঁর আত্মজীবনী এল দিয়েগোর শুরুতেই তিনি লিখেছেন, “মাঝেমধ্যে ভাবি, আমার পুরো জীবনটাই একটা সিনেমার মধ্যে চলছে।” ফুটবল জগতে বিপ্লবের অগ্রদূত দিয়েগো। কোটি কোটি মানুষ দিনের পর দিন ফুটবল মাঠের সবুজ গালিচায় সেই বিপ্লবকে জন্মাতে দেখেছে।

মাঠে তো বটেই, মাঠের বাইরেও ম্যারাডোনা ছিলেন অনন্য এবং অদ্বিতীয়। পুরোদস্তুর রাজনীতির লোক না হলেও আপাদমস্তক এক জোরালো রাজনৈতিক সত্ত্বা ছিল ম্যারাডোনার। দিয়েগো নিজের মতো করে জাগিয়েছেন আর্জেন্টিনা এবং লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষকে। নিজের শৈশব ও কৈশোর নিদারুণ দারিদ্র্য ও কষ্টে কেটেছে এবং পরবর্তীকালে খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষ নিয়েছেন। ম্যারাডোনার কাছে ফুটবল ও রাজনীতি আলাদা ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন—

“আমি যা, আমি জনগণের কারণে।”

ফিদেল কাস্ত্রো ঘনিষ্ঠ ম্যারাডোনা নিজেকে গর্বের সঙ্গে বামপন্থী হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদ ও পুঁজিবাদী রাজনীতির কড়া সমালোচক ছিলেন। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দরিদ্র জনগণের পক্ষে তিনি সবসময় কথা বলেছেন। ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ-এর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি লাতিন আমেরিকার ঐক্য, মার্কিন প্রভাব থেকে মুক্তির পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলতেন।

আজকের দিনে 2026 সালে দাঁড়িয়েও, সভ্যতার চাকা এতদূর গড়িয়ে যাওয়ার পরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ংকর বেপরোয়া সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের কবলে প্যালেস্টাইন এবং লাতিন আমেরিকান দেশগুলি। আমেরিকার এই বর্বরতার চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা দেখেছি কিভাবে ইসরাইলের সাথে হাত মিলিয়ে প্যালেস্টাইনে শিশুহত্যা থেকে শুরু করে গোটা gaza শহরটাকে প্রায় ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা পরবর্তীকালে দেখলাম, সভ্যতার লজ্জা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য একটি দেশ ভেনেজুয়েলার তেলের খনি বেআইনিভাবে লুট করবার ধান্দায় রাতারাতি ফোর্স পাঠিয়ে মানুষের ভোটে যেটা একজন প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক গ্রেফতার করে আনলো। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের দাঁত নখ বেরিয়ে আসে, অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব তছনছ করে দিতে যায় এভাবেই, আর তখন মানুষকে রাস্তায় নামতে হয় ঠিক যেমনভাবে ভেনেজুয়েলা সহ পৃথিবীর সমস্ত দেশের শান্তিকামী মানুষ নেমেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যেখানে বেলাগাম ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, ম্যারাডোনা সেখানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে শেখান। ২০০৫ সালে কিউবা তাকে দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানগুলোর একটি “José Martí Order” প্রদান করে, যা তিনি গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাষ্ট্রঘেঁষা কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মান/স্বীকৃতি তিনি নেননি—এটা ছিল তার রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ।
এক ইন্টারভিউতে তিনি স্পষ্ট জানান “The Americans gave me an award. They gave me one in Cuba as well. I told the Americans: Keep it for yourselves, I’m getting one in Cuba!”

আজকের সাম্রাজ্যবাদকে শুধুমাত্র যুদ্ধ বা সেনা দিয়ে মাপা যায়না। অর্থনৈতিক চাপ, কর্পোরেট ও মিডিয়া প্রভাব, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার বাণিজ্যিকীকরণ এর মাধ্যমেই প্রভাব বিস্তার করে সাম্রাজ্যবাদ। ফুটবলও এর বাইরে নয়—ফিফা, স্পনসর, ব্র্যান্ডিং—সবকিছুই শক্তিধর দেশ ও কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণে।

ম্যারাডোনা আজ বেঁচে থাকলে কোথায় দাঁড়াতেন?

সম্ভবত তিনি থাকতেন—

কর্পোরেট ফুটবলের বিরুদ্ধে, ফিফার ক্ষমতাকেন্দ্রের সমালোচনায়, দরিদ্র দেশ ও জনগণের পক্ষে। তিনি কখনোই “নিরপেক্ষ” থাকতেন না। সামাজিক মাধ্যমে হোক বা রাস্তায়—তার কণ্ঠ থাকত স্পষ্ট ও আগ্রাসী।

ম্যারাডোনা বিশ্বাস করতেন ফুটবল হচ্ছে জনগণের ভাষা, আর সাম্রাজ্যবাদ সেটাকে পণ্যে পরিণত করে।

আজকের সুপারস্টাররা যেখানে ব্র্যান্ড-সচেতন ও স্পনসর-নির্ভর, সেখানে ম্যারাডোনা ছিলেন অস্বস্তিকর—কারণ তিনি নিয়ন্ত্রণ মানতেন না। তিনি প্রতিরোধের প্রতীক তৃতীয় বিশ্বের আত্মসম্মানের প্রতীক “আমরাও পারি” এই বিশ্বাসের প্রতীক।

“হ্যান্ড অব গড” শুধু একটা গোল নয়—তা ছিল নিপীড়িতের নীরব প্রতিশোধ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের গোলটি অনেক আর্জেন্টাইন-ই দেখেছিল ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে। ম্যারাডোনা নিজেও পরে বলেছিলেন, সেটি ছিল “একটু মাথা, একটু ঈশ্বর” — কিন্তু আবেগগতভাবে এটি রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ নেয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছায়া যেখানে ঘুরে বেড়াত, সেখানে দরিদ্র আর্জেন্টাইন ছেলেটি ঈশ্বরের হাত হয়ে ন্যায়ের ভারসাম্য ফিরিয়ে দিয়েছিল। তিনি জানতেন, ফুটবল কেবল খেলা নয়—এটি শ্রেণির, রাজনীতির, এবং মর্যাদার সংগ্রাম।
নাপোলিতে তিনি ছিলেন শহরের আত্মা। শ্রমিকেরা তাঁকে দেখত নিজেদের মতো—একজন যে উপরে উঠেছে মাটি ছুঁয়ে, যে জিতেছে কিন্তু কখনো ক্ষমতার পক্ষে দাঁড়ায়নি।

বিখ্যাত উরুগুইয়ান ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক এদুয়ার্দো গ্যালানো, যিনি নিজেও সারা জীবন সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক দক্ষিণ আমেরিকানদের ওপর হওয়া অন্যায়-অত্যাচার নিয়ে লিখে গেছেন, তিনি একবার বলেছিলেন, “ম্যারাডোনার কণ্ঠই অনুরণিত হয়ে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতাবান ও শোষকদের দিকে অপ্রিয় সব প্রশ্ন ছুড়ে দিতে সাহস জুগিয়েছে অনেককে।”

ম্যারাডোনা ছিলেন শিল্পী, কারণ তিনি ফুটবলের সীমা ছাড়িয়ে এক নন্দনতত্ত্ব তৈরি করেছিলেন এবং সেই নন্দন ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক ভাষা। তিনি নিজেকে সবসময় দরিদ্র মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতেন। বিলাসী এলিট সংস্কৃতি, ফিফা ও কর্পোরেট ফুটবলের বিরুদ্ধেও তিনি প্রায়ই কথা বলেছেন।

দিয়েগো সর্বত্র — ভিলা ফিওরিতোর রাস্তাগুলো থেকে শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চ পর্যন্ত, মাঠ থেকে মানুষের হৃদয়ের গভীর পর্যন্ত। দিয়েগো ম্যারাডোনা আজ আর মাঠে নেই, কিন্তু তাঁর প্রতিটি ছোঁয়া আজও ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে। যেখানে বল গড়ায়, সেখানে এখনো শোনা যায় এক নিঃশব্দ ঘোষণা :

“মানুষ জিততে পারে, যদি সে হৃদয় দিয়ে খেলে”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *