বাংলা বাঁচাও যাত্রীর ডায়েরী
সৌম্যশুভ্র চট্টোপাধ্যায়
ওরা আসলে জানেনা, এলাকার মানুষের খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয় সেই এলাকার ভৌগলিক ও এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর। আমাদের গাঁয়ের দিকে মুরগিও সেই ভাবেই কাটা হয়, আর সেই ভাবেই সেই এলাকার হিন্দু মুসলিম খেয়েও অভ্যস্ত। তাই এরাজ্যে আজও রমজানে ‘রাম’ আর দেওয়ালির ‘আলি’ বুকে বুক মিলিয়েই পালন করে। বাংলা বাঁচাও যাত্রা সেই কথা বলে এসেছে পাহাড় থেকে কামারহাটি—”সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাঁচাও, বাংলা বাঁচাও”
এক চাচার বাড়িতে ছোলার রুটি, বেগুন পোড়া, লঙ্কার চাটনি খাওয়ার পর, সারাদিন আর কিছু খেতে হয়নি। ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ জীবনে বিলাসবহুল খাবার শুনে অবাক হলেন? হবেন না প্লিজ। সবার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যর লড়াইয়ের কথা আরকি। নরসিংপুর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে একটা প্রত্যন্ত গ্রাম। গ্রামের মোট ভোটার ১৫০০। বর্তমানে এলাকায় থাকেন ৯০০ জন। বাকী? গ্রাম-কে গ্রাম অন্যরাজ্যে। কাজের সন্ধানেই। গ্রামটায় বুথের সংখ্যা দুই। বর্তমানে দুটোই বামপন্থীদের দখলে। সেদিনের রাত্রীবাস ছিলো ওখানেই। যাত্রার ওই ১১তম দিনের কথা বলছি।
ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দিন স্মরণ করে যে যাত্রা শুরু হয়েছিলো, তা তখন মাঝরাস্তায়। মাঝের ১০ দিনের হাজারও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তখন বুকের বারুদে আগুন শুধুই। প্রশ্ন ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার নামে একটা ইউনিভার্সিটি হলো। কিন্তু কেন ভিসি নাই? ২য় ক্যাম্পাস নামকে ওয়াস্তে আছে, কেন পৌছানোর মত রাস্তা নাই? “শিক্ষা বাঁচাও, ছাত্রর অধিকার বাঁচাও।“ আর সেই লড়াইয়ে সাড়া দিয়ে প্রস্তুত তুফানগঞ্জ থেকে ভাটিবাড়ি। ১৮ কিলোমিটার পথ জুড়ে মানুষ অপেক্ষারত নিজের দাবিতে লড়াই নিজে লড়তে।
এরই মাঝে এক দুর্ঘটনা ঘটে! ট্রেনের ধাক্কায় ২ হাতির মৃত্যু। রাতের অন্ধকারে, দিনের আলোতে জঙ্গল লুটেরই ফল। বন্যপ্রাণী বাধ্য হচ্ছে লোকালয়ে আসতে। এলাকায় ছুটে যায় নেতৃত্ব। মৃত হাতির লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কশম- “উত্তরবঙ্গের জঙ্গল বাঁচাও, বাংলা বাঁচাও” এই লড়াইও বাসস্থান বাঁচানোর লড়াই, ঠিক যেমন আরাবল্লি বাঁচানোর লড়াই। তেমনটায়। যা আবারও মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীটা মানুষের বাপের একার না। নতুন পথ, নতুন লড়াইয়ের রাস্তা নিজেই বেরিয়ে আসছে।
ততক্ষণে ধুপগুড়ির বুকে বাংলা বাঁচানোর শপথ। রাস্তার দুইপাশে আলু বীজের দোকান। তবে চাষির হাত মাথাতেই! বীজ ও সারের দাম আকাশছোঁয়া। ফসলের ন্যায্য দাম নেই। সহায়ক মূল্য তো নেইই! নেই খেতমজুরের মজুরি। চা বাগানের শ্রমিকের মজুরি এক কেজি চালের দামের চেয়েও কম। বাগানগুলোতে বন্ধ রেশন। মানুষ খাবে কি? না খেয়ে গতরে খাটবে কিভাবে? অঙ্গিকার- “চা শ্রমিক বাঁচাও, উত্তরবঙ্গ বাঁচাও, বাংলা বাঁচাও”
রাভা, রাজবংশী, কোচ, মেচ, টোটো, ওরাওঁ, ডুকপা সমেত ঐবাংলা থেকে আসা উত্তরবঙ্গের সকল মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা এক। জীবন যন্ত্রণা এক। চাল-নুন-আলু-মশলার সমস্যা এক। তাই সকল জনগোষ্ঠী যখন একসাথে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে! স্বৈরাচারী-ফ্যাসিস্ট সরকার তখন বিভাজনের রাজনীতিতে মাতিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু আর প্ররোচনায় পা দেয়নি বঙ্গের উত্তর দিক। ভাষা-বর্ণ-জাতী-উপজাতী বিদ্বেষ ভুলে অস্তিত্ব বাঁচানোর লড়াইয়ের মশালে তেলে ঢালছেন তাঁরা।
আর সেই কারণেই তো ডালখোলা থেকে রসাখোয়া পর্যন্ত বাইক মিছিলে যৌবনের ঢল। হ্যাঁ জেন জি। যাদের লড়াইয়ের ফসল নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে বাড়ি-দেশ ছাড়তে হয়েছে।
মাইরি বলছি, ঠিক যখন আগের লাইনটা শেষ হলো! তনুশ্রীর ফোন এলো। চেনেন না? তনুশ্রী আমার ক্লাসমেট। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ২য়। মেধাবী ছাত্রী, মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকেও স্কুলে ২য় ও। জানুয়ারির ২৫ তারিখ স্কুলের বন্ধুরা পিকনিক যাবো। সেই বিষয়েই ফোন। ফোন করে ও জানালো, “যারা মুসলমান তাঁরা তো ওই মুরগি খাবে না! গ্রুপে ম্যাসেজ করেছিলাম, ডিলিট করে দে। তুই অ্যাডমিন।” ভাবতে পারছেন? মানুষের মনে জাতপাত কোথায় গিয়ে ঠেকেছ! শিক্ষিত মানুষও কিভাবে অজান্তে সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে? যে বন্ধুর সাথে এক থালায় ছোট থেকে ভাত খেয়েছি, তাঁদের নাকি জাত দেখতে হবে। হালাল আর হারামের ফারাক খুঁজতে হবে?
ওরা আসলে জানেনা, এলাকার মানুষের খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয় সেই এলাকার ভৌগলিক ও এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর। আমাদের গাঁয়ের দিকে মুরগিও সেই ভাবেই কাটা হয়, আর সেই ভাবেই সেই এলাকার হিন্দু মুসলিম খেয়েও অভ্যস্ত। তাই এরাজ্যে আজও রমজানে ‘রাম’ আর দেওয়ালির ‘আলি’ বুকে বুক মিলিয়েই পালন করে। বাংলা বাঁচাও যাত্রা সেই কথা বলে এসেছে পাহাড় থেকে কামারহাটি—”সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাঁচাও, বাংলা বাঁচাও”
দিনও এগিয়েছে, বিপরীত দিক থেকে আঘাতও বেড়েছে। তাতে লালঝান্ডা কাঁধে লোকজন একটু বেশীই খুশি হয়েছি। আই প্যাকের দপ্তরে ইডির হানার নাটক, রাজ্য পুলিশকে দিয়ে ফাইল সরিয়ে দেওয়া এসব ধরে ফেলেছে বাংলা। ওই যে, আমাদের গাঁয়েঘরে একটা কথা আছে, “পড়লো কথা হাটের মাঝে। যার কথা তাঁর গায়ে বাজে”। চলতি ১৪ বছরে পশ্চিমবঙ্গ যে রসাতলে যেতে বসেছে। ১৪ বছর ধরে রাজ্যে যে রাজনীতি তৃণমূল আমদানি করেছে! যা পশ্চিমবঙ্গে কোনদিন ছিলো না। জাতের নামে বজ্জাতি, ধর্ম পালনের নামে ধর্মকে বাদ দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা, তাতে সবচেয়ে বেশী লাভবান হয়েছে এরাজ্যে বিজেপি। যখন বামফ্রন্টের সরকার ছিলো, এরাজ্যে বিজেপির নামগন্ধ ছিলোনা। ১৯৯৮ এ কংগ্রেস দলের সবচেয়ে যারা নিকৃষ্ট, তাঁদের সঙ্ঘ পরিবার জড়ো করে এই তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করে। ১লা জানুয়ারি যখন লেবার রুমে তৃণমূলের জন্ম হচ্ছে, “লেবার রুমে দায় মা হয়ে বাজপায়ি, আদবানি দাঁড়িয়েছিলেন।“ তবে মাঝেমাঝে ওরা এমন ঝগড়া করে, ওই ধরুন টিভির চ্যানেলে, খবরের হেডলাইনে, ব্রিগেডের মাঠে, অথবা স্থান বিশেষে টুইট-প্রেস রিলিজে । এসব গুলিয়ে ফেলবেন না! আসলে ওপরে যত ঝগড়া, ভেতরে তত প্রেম। ওরা জানে একজন আরেকজনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে! রাজ্যের মাটিতে যতদিন তৃণমূল আছে, তৃণমূলের দূর্নীতি আছে, দুষ্কৃতী আছে, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা আছে, মানুষকে দেওয়া কথার খেলাপি আছে! ততদিন রাজ্যে বিজেপি প্রাসঙ্গিক। কখনও সবুজ ফাইলে, কখনও মাংস কাটার স্টাইলে, কখনও বিরিয়ানির স্টলে, কখনও “টিকির গিঁটে, দাঁড়ির ঝোপে “। আর এই সাম্প্রদায়িকতা উৎখাত করতেই মালদা, মুর্শিদাবাদে যখন পৌছালাম আমরা, পরিবার গুলোকে জিজ্ঞেস করলাম! “হ্যাঁ গো, তোমাদের বাড়ির ছেলেটা কোথায়” একটায় উত্তর সবার কন্ঠে- ছা’টা, বাইরে কাজে গেছে। আর ফলাফল? SFI DYFI CITU AIARWU কে সপ্তাহে ৪ টা দিন ব্যস্ত থাকতে হয় বাইরের রাজ্য থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের লাশ ঘরে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে। এই বাংলা চেয়েছিলেন নাকি? সিঙ্গুরের ৯০% হয়ে যাওয়া কারখানা, নন্দীগ্রামের ক্যামিক্যাল হাব! যা তৈরিতে দুই জেলার ছেলেগুলো কাজ পেত। ও গো! বলি সিঙ্গুর থেকে শিল্প তাড়ানো মমতার পাশে সেদিন রাজনাথ সিংও ছিলো। ১৮ জানুয়ারি মোদী তাহলে কি মুখ দেখাতে সিঙ্গুর আসবে বাপু? লজ্জা করেনা?
লালঝান্ডা তাই দাবি করে গোটা যাত্রাপথে, শিল্পের জমিতে শিল্পই চাই। শিল্প সম্ভাবনাময় এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে চাই। রাজ্যের যুবদের ঘরে ফেরাতে চাই। ওদের কর্মসংস্থান রাজ্যেই চাই। তাই বুদ্ধ বাবুর বাংলা গড়তে চাই। “মরতে থাকা শিল্প বাঁচাতে চাই, বাংলাকে আবার বাঁচাতে চাই”
আর যতদিন তা না হচ্ছে, আমাদের বাড়ির ছেলেগুলো যারা বাইরে পড়ে আছে। যাঁদের পাঠানো টাকাতে এই রাজ্যের অর্থনীতি মজবুত হচ্ছে। কেন ক্লাবে ক্লাবে অনুদানের নামে সেই টাকাতে ভোটলুটেরা বাহিনী তৈরি হচ্ছে? টাকাটা পিসির বাপের টাকা? তৃণমূলের দাদুর জমিদারির টাকা? নাকি ভাইপোর মাতাজীর পেনসনের টাকা? টকাটা এরাজ্যের যুব সমাজের পায়ের ঘাম মাথায় তোলা টাকা। তাহলে কেন রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিককে ভীনরাজ্যে ডিজিটালি রেশন দিতে পারেনা সরকার? কেন একটা স্বাস্থ্যর কার্ড দিতে পারেননা মমতা ব্যানার্জী? অপরদিকে সরকারি সংস্থা বেসরকারি হয়ে যাচ্ছে, তাহলে কাজ কোথায় হবে? তৃণমূল-বিজেপি নেতারা দুহাতে কামাচ্ছে! আর গরীব খেটে খাওয়া কর্মীরা পরিযায়ী শ্রমিক হচ্ছে। মাঝে সপ্তাহে দুদিন করে বিজেপি নেতারা হেলিকপ্টারে করে আসবে, গরিবের ঘরে ভাত খাবে, উড়ে চলে যাবে। বাংলা বাঁচবে? তাই “পরিযায়ী শ্রমিক বাঁচাও-বাংলা বাঁচাও”।
আর যদি কোনোভাবে আপনি এরাজ্যে থেকে গেছেন, উত্তর দিনাজপুরেই ৫লক্ষ ৪ হাজার ৩৮২ টা জবকার্ড হোল্ডারের ৪ বছরে ৪০০ দিন করে ২৬০ টাকা দৈনিক মজুরি+কাজ আটকে রেখেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। সারা রাজ্যে ভাবুন তাহলে। মানুষ খাবে কি? রেশনের ফ্রি চালে মাসের ৪ দিন চলে, বাকী ২৬ দিন অনাহার? ধিক্কার! ১০ লাখি শুট পরা প্রধানমন্ত্রী, ১ লাখি আইফোন ব্যবহারী মুখুমন্ত্রী। আসলে পাশের জেলা দক্ষিণ দিনাজপুরও জানে বছরে ২ কোটি চাকরির ভাঁওতা! তাহলে বুথ পিছু চাকরি ২৪৮ টা হয়, একটু নিজের পাড়াতেই দেখুন না, কোন ২৪৮ টা ছেলে চাকরি পেয়েছে। ওই জেলাতেই বা তাঁত শিল্পীদের কি অবস্থা? যে পাড়ায় ৮০ টা তাঁতশাল ছিলো, আজ মাত্র ৫ টা। “ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প বাঁচাও তাঁত শিল্পী বাঁচাও, বাংলা বাঁচাও” গঙ্গারামপুরের দই খেয়ে মন ভরবে না প্রিয়। মানুষ না বাঁচলে দই খামু কেমনে? হ্যাঁ, তাঁতিদের অনুদানের টাকাও খেয়ে নিলো তৃণমূল। সেই টাকাতে বানালো পার্টি অফিস। এক তাঁতি বলছেন, “তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে বড় কথা না। আগে অফিস বানিয়ে নিলো” একই ছবি নদীয়া, আমার শহর বিষ্ণুপুরেও। ছিঃ এরা মানুষ? ধিক্কার!!
এমন সময় আমাদের অপেক্ষায় কিছু মহিলা। পেশাতে বিড়ি শ্রমিক। বক্তব্য বিড়ি শ্রমিকের মজুরি তো চা বাগানের শ্রমিকের মজুরির মতই। বাড়ির মেয়েরা ৪ দিনে ১ হাজার বিড়ি বেঁধে পান মাত্র ৫০-৮০ টাকা। ঘরের মরদ পরিযায়ী শ্রমিক, ছেলের ইস্কুলে পড়াশুনা হয়না, মাস্টারই নাই। আর বিড়ি বেঁধে সেই টাকাও আসেনা! যাতে বেসরকারি ইস্কুলে পড়াবে। আচ্ছা ওরা বাঁচবে না? ওরা ডাল ভাত টুকুও খাবেনা? দাবি- “বিড়ি শ্রমিক বাঁচাও, বাংলা বাঁচাও”
কনকনে ঠান্ডা, চারিদিকে কুয়াশার রাতে প্রবেশ মালদায়, গঙ্গা পাড়ে একটা স্কুলে প্রাথমিক ভাবে খাবারের আয়োজন। তখন রাত্রি ১১টা! দুপাশে মানুষ দাঁড়িয়ে এক টুকরো লড়াইয়ের উত্তাপ ভাগ করতে। আরও মাটির কাছে, আরও কান খাড়া করে যন্ত্রণা শুনতে হাজির বাংলা বাঁচাও যাত্রা। যা চিৎকার করে বলার পরেও শাসক শোনেনি! সেই বক্তার উঠানে পৌঁছে গেছি ততক্ষণে। সমস্যা গুলো কিছুটা আগাম জানা, আর কিছুটা মাটিতে নেমেই। নদী ভাঙন, বাড়ি তো দূর! গ্রামের পর গ্রাম নদীগ্রাসে। কে কাকে বাঁচাবে? ভুতনীর চর এলাকায় যখন “বাবু দা” আমাদের নিয়ে গেলেন, চক্ষু চড়কগাছ, প্রবল ঠান্ডায় ঘর হারিয়ে ৫০০ এর বেশী পরিবার তাঁবুর নীচে ছাগল মানুষে এক বিছানায় বাস। চাঁপা দি এলাকার নেত্রী, চাঁপা দির চায়ের দোকানের সামনেই বসলো ভূতনী বাঁচানোর সভা। জমি পাইয়ে দেওয়ার মিটিং। কথা পরিস্কার, স্পষ্টও! ঘর বানাতে জমি চাই, আর ঘর না পাওয়া পর্যন্ত ঘেরাও করে রাখবো বিডিও কে। বালির বস্তার বাঁধ না। চাই পাকা কংক্রিটের বাঁধ। “নদী ভাঙন বাঁচাও, বাংলা বাঁচাও” এ গলা মেলালেন মানুষ। এখানেই খান্ত থাকেনি মালদা, চাঁচলের মানুষ একজোট হয়ে দাবি করেছেন ওয়াকঅফের সম্পত্তি বেচতে দেবো না। ‘ওয়াকঅফের সম্পত্তি বেচে বড়লোক হওয়া নেতাদের ঘাড় ধরে রাস্তায় নামাবো।‘ আসলে এই লড়াই লড়তে ধক লাগে, যেখানে ওয়াকঅফ সংশোধনী বিল জ্বালিয়ে দেওয়ার হিম্মত থাকে।
আগুন আরও জোরালো, মালদা পেরিয়ে ততক্ষণে ফারাক্কায়। সেই ১১ তম দিনের দাবিগুলোই জোরালো। খড়গ্রাম বাঁচাও যাত্রা ততক্ষণে মিলেছে মূল যাত্রার সাথে। চাষির দাম, খেতমজুরের মজুরি মিলেমিশে একাকার পরিযায়ী শ্রমিকের যন্ত্রণার সাথে। উপস্থিত হয়েছেন মাইক্রো ফাইন্যান্সের জালে পরিবার গুলোও। চড়া সুদের ঋণে ডুবে যারা, টাকা মেটাতে না পারলেই বাড়িতে বক্সার, যমদূত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে ঋণ মকুব কর, অথবা স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে আয়। আত্মহত্যা করছে ঋণগ্রস্থ বাংলা, বাংলার মা-রা। এ মেনে নেওয়া যাবে না। চিৎকার ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ থেকেই- “মাইক্রোফাইনান্সের জাল থেকে পরিবার বাঁচাও। বাংলা বাঁচাও”।
• আর সবকিছু থেকে শিক্ষা নিয়েই, নদীয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে পরিযায়ী শ্রমিক সহায়তা কেন্দ্র।
• মাইক্রো ফাইনান্সের জাল থেকে মানুষকে বাঁচাতে আইনি সহায়তা কেন্দ্র।
• বর্ধমান, হুগলীর চাষিদের পাশে দাঁড়াতে প্রতিটি এরিয়া কমিটির অফিসে গড়ে উঠেছে কৃষক সহায়তা কেন্দ্র। ঋণের দায়ে আর আত্মঘাতী কৃষক না। যারা ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলায়! সেই চাষিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ ন্যায্যই দিতে হবে।
• হাওড়া, উত্তর ২৪ এর বন্ধ পাট শিল্প দ্রুত চালু করতে হবে।
• সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় (বনগাঁ বর্ডারেও) চাষিদের নিজের জমিতে চাষ করতে দিতে হবে।
• মতুয়াদের দয়া ভিক্ষা না। অবিলম্বে নাগরিকত্ব প্রদান করতে হবে ঘৃণ্য রাজনীতি দূরে সরিয়ে।
রাজ্যের প্রতিটি মানুষের সমস্যার সমাধান করতে তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রস্তুত ১লক্ষ বুথের কমরেডরা। শুধুমাত্র একটা বাংলা বাঁচাও যাত্রা না। জেলায় জেলায় আবারও নবান্ন অভিযানের ডাক দিচ্ছে খেতমুজুর-কৃষক-শ্রমিকরা। এলাকার সমস্যা সমাধানে কোথায় ঘেরাও প্রধান, কোথাও বিডিও সাথে কোথাও ডি-এমও। ঝাড়গ্রাম বর্ডার থেকে সিমলাপাল পদযাত্রা তারই প্রমাণ। জয়কৃষ্ণপুর থকে বিষ্ণুপুর জাঠাও সেই লড়াইয়ের অংশ। আর এই লড়াইয়ে পুয়াল(খড়ের গাদা) মতই জড়ো করতে হবে গরিব খেটে খাওয়া মানুষকে। যাঁদের অদম্য জেদ, ‘কোদালের বাঁট’ দেখে ১০০ দিনের কাজ চালু করতে বাধ্য হয় দুই শাসক। হয় কাজ দে, ভাত দে, কম দামে সার দে, ন্যায্য মজুরি দে, সঠিক দামে ফসল কেন, বন্ধ স্কুল গুলা খোল, বিভাজন বন্ধ কর। মন্দির মসজিদ লয়, হাসপাতাল লিয়ে কথা বল। “নাহলে কোদালের বাঁটটা মাথায় বসিয়ে দেবো”। এই উদ্দামেই প্রস্তুত বাংলা। শুধু বুকের আগুনে শুকনো পাতা সময়ে সময়ে দিতে হবে। তাতেই জয় নিশ্চিত।
দুর্নীতি ও দুষ্কৃতীর আতুড়ঘর থেকে বাংলাকে বাঁচাতে হবে, সন্ত্রাস- সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে বুথে বুথে। ঘরে যা আছে, ঝাটা-খুন্তি-হাতা, জুতা- আঁশবঠি- কাস্তা-হাতুড়ি-তারা যা আছে তা নিয়েই।
কেনে?
এটা জ্যোতি বাবুর বাংলা বঠে। অত সহজে হারবো নাই।
জমিদার জোদ্দারের মাথায় লাঠি ধরার অভিজ্ঞতা আমাদের আছে।
তৃণমূল-বিজেপির বিপরীতে কালকেও উটাই করবো।