আইজেনস্টাইন ও শতবর্ষে যুদ্ধজাহাজ

তার মৃতদেহকে ঘিরে ওডেসার সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও ক্ষোভ জন্মায়। এই দৃশ্যেও মন্তাজের ব্যবহার অসামান্য। ভাকুলিনচুকের মৃতদেহ শায়িত ওডেসার সমুদ্রতীরে এবং তাকে একে একে শ্রদ্ধা জানাতে আসছে জনগণ। আইজেনস্টাইন ইচ্ছে করেই ভাকুলিনচুককে ছবির অনেকটা অংশ জুড়ে অদৃশ্য করে দেন।

১৯৬২ সালে ব্রিটিশ চলচ্চিত্র সমালোচক টম মিলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফরাসি নব তরঙ্গের অন্যতম পরিচালক জঁ লুক গোদার বলেছিলেন যে আসলে দুই ধরনের সিনেমা আছে, প্রথমটি ফ্ল্যাহার্টি এবং দ্বিতীয়টি আইজেনস্টাইন। ফ্ল্যাহার্টি বলতে ডকুমেন্টারি রিয়ালিজম এবং আইজেনস্টাইনের প্রসঙ্গ থিয়েট্রিকাল পন্থার উদাহরণ হিসাবে গোদার এই মন্তব্যে ব্যবহার করেছেন। গোদার বলছেন এই দুই পন্থা সর্বোচ্চ স্তরে এক এবং অভিন্ন। ডকুমেন্টারি রিয়ালিজমের মাধ্যমে একজন থিয়েটার কাঠামোতে পৌঁছাতে পারেন অথবা এর উল্টো অর্থাৎ কল্প কাহিনী অবলম্বন করে বাস্তবতায় পৌঁছানো – এই দুই পদ্ধতির দ্বারাই একজন মহান পরিচালক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

আইজেনস্টাইন দ্বিতীয় পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, অর্থাৎ নাট্য কাহিনীর মাধ্যমে জীবনের বাস্তবতা ছুঁয়ে দেখেছিলেন রুশ পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টেইন।

১৯১৭-র বিপ্লব পরবর্তী বলশেভিক কমিউনিস্ট সরকারের জাতীয়করণের ভিত্তিতেই রুশ দেশের চলচ্চিত্র তার জয়যাত্রা শুরু করে। চলচ্চিত্র শিল্পের জাতীয়করণ সংক্রান্ত ফরমান ( ২৭ আগস্ট, ১৯১৯ ) অনুযায়ী সিনেমাকে বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং রাজনৈতিক শিক্ষা ও গণসচেতনতার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই চিন্তাই রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয় এবং সেই নীতির ভেতরেই আইজেনস্টাইনের উত্থান। সোভিয়েত সিনেমার প্রথম পর্ব (১৯২২ – ৩২) চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সৃষ্টিশীল পর্ব। আর এই পর্বেই ১৯২৫ সালে মুক্তি পায় সের্গেই মিখাইলোভিচ্ আইজেনস্টাইন পরিচালিত চলচ্চিত্র ইতিহাসের সর্বকালের মাইল ফলক ছবি ‘ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন’ (যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিন)। এই ছবি নিয়ে প্রতিটি দশকে পর্যালোচনা চলেছে। এই ছবির থিয়াট্রিকাল পর্যায়, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার এবং গবেষণা ধর্মী চলন সিনেমার ইতিহাসে নজির গড়েছে। আইজেনস্টাইনের এটি ছিল দ্বিতীয় ছবি যা তাঁকে শিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। চলচ্চিত্রের শৈল্পিক আঙ্গিক হিসাবে পোটেমকিন অদ্বিতীয় – পৃথিবীর আর কোনো চলচ্চিত্র সম্পর্কে সারা বিশ্বে এত পর্যালোচনা, গবেষণা হয়নি। ১৯০৫ সালের রুশ বিপ্লবকে কেন্দ্র করে এক সাগা তৈরি করাই ছিল এই ছবির প্রাথমিক উদ্দেশ্য। শুরুতে এই ছবির নামকরণ করা হয় ‘১৯০৫’। জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থানের মহাকাব্য রচনার উদ্দ্যেশে শুরু হয় চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাথমিক কাজ। আইজেনস্টাইন মস্কো থেকে ওডেসা আসেন ছবির কিছু দৃশ্য নির্মাণের উদ্দেশ্যে। সেখানে এসে নৌ বিদ্রোহের নাটকীয়তা তাঁকে প্রভাবিত করে। সমগ্র রুশ বিপ্লবের বদলে শুধুমাত্র নৌ বাহিনীর বিদ্রোহ হয়ে ওঠে ছবির মূল বিষয়বস্তু। এখানেই আসে শুরুতে উল্লেখিত গোদারের বক্তব্য। ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ আইজেনস্টাইনের গবেষণাধর্মী নির্মাণ শৈলীর দ্বারা মিথিকাল বা প্রতীকী রূপে প্রবাহের মাধ্যমে বাস্তবের বিদ্রোহের কাছে পৌঁছায়।

ছবিটি ক্রনিকাল প্লে’র নিয়ম মেনে বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত। যেমন ‘মানুষ এবং মাংসকীট’, ‘কোয়ার্টার ডেকের নাটক’ ইত্যাদি। তবে যে অধ্যায় নিয়ে সর্বোচ্চ চর্চা হয়েছে এখনো পর্যন্ত তা হলো এই ছবির চতুর্থ অধ্যায় ‘ওডেসা সিঁড়ি’ ( Odessa Steps )। শুধু মাত্র এই দৃশ্যটি অবলম্বন করে পিয়ের লুইজি লাঞ্জা নামের এক ইতালিয়ান একটি গোটা বই লিখেছিলেন। এই দৃশ্যে সাধারণ মানুষের ওপর জারতন্ত্রের আগ্রাসনের নির্মমতা এবং মানুষের অসহায়তা সাংঘাতিক অভিঘাত তৈরি করে।

ওডেসা স্টেপস্’র প্রসঙ্গ এলেই যে বিষয়টি উঠে আসে তা মন্তাজের ব্যবহার। আইজেনস্টাইন প্রসঙ্গে আলোচনায় মন্তাজ সম্পর্কিত কথা বলতেই হয়। ‘মন্তাজ’ কথাটি ফরাসি যার অর্থ একত্র করা, মূলত সম্পাদনাকে বোঝায়। রুশ পরিচালক কুলেশভ এবং পুদোভকিন মন্তাজের উৎস এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের দিশা দেন। আইজেনস্টাইন সেই রাস্তায় পদার্পণ করেন এবং মন্তাজ ব্যবহারে নিদর্শন তৈরি করেন। পুদোভকিন বলতেন দুটি শট-এর মিলন হলো মন্তাজ। কিন্তু আইজেনস্টাইন বলতেন দুটি শটের সংঘাতই হলো মন্তাজ। অর্থাৎ দুটি ভিন্ন শটের সংঘাতে তৃতীয় বক্তব্যের জন্ম দেওয়াই মন্তাজের মূল কাজ বলে মনে করতেন তিনি। এখানে মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের সাথে আইজেনস্টাইনের মন্তাজ প্রয়োগের সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায়। ব্যাটেলশিপ চলচ্চিত্র এবং বিশেষ করে ওডেসা সিঁড়ির দৃশ্য এই মন্তাজ প্রয়োগের নজির তৈরি করে। দৃশ্যের যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ তা হলো : আন্দোলন রত সাধারণ মানুষের ওপর সামরিক আক্রমণ, সৈন্যেরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়, সাধারণ মানুষ ছুটে যায়, একটি বেবি কার্গো নিচে গড়িয়ে যায়, নারীরা, শিশুরা, সাধারণ মানুষ নিহত হয় —

এতগুলো দৃশ্য মন্তাজের মাধ্যমে প্রদর্শিত হয় যা একেবারেই দৃশ্যনাট্যিক উদ্ভাবন। পরবর্তীকালে বহু বিখ্যাত চলচ্চিত্রে ব্যাটেলশিপের এই দৃশ্যটিকে হোমাজ দেওয়া হয়।

ব্যাটেলশিপ পোটেনকিন ব্যাক্তি থেকে সমষ্টি হয়ে ওঠার গল্প। ছবিটিতে কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র না থাকলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো ভাকুলিনচুক। তিনি মূলত collective hero ধারণার চেতনার স্ফুলিঙ্গ—একজন ব্যক্তি যিনি জনগণকে জাগিয়ে তোলেন, কিন্তু নিজে একক নায়ক হয়ে ওঠেন না।

বিপ্লবের সূচনাকারী প্রতীক ভাকুলিনচুকই প্রথম নাবিকদের মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলেন। ছবির মূল কাহিনীতে পচা মাংসের ঘটনার সময় তার প্রতিবাদ থেকেই বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।

তার মৃত্যু ছবির কেন্দ্রীয় বাঁক এখানে শহীদের ভূমিকা (Martyr Figure) কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তিনি মারা যাওয়ার পরই বিদ্রোহ ব্যক্তিগত প্রতিবাদ থেকে সমষ্টিগত আন্দোলনের রূপ নেয়।

তার মৃতদেহকে ঘিরে ওডেসার সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও ক্ষোভ জন্মায়। এই দৃশ্যেও মন্তাজের ব্যবহার অসামান্য। ভাকুলিনচুকের মৃতদেহ শায়িত ওডেসার সমুদ্রতীরে এবং তাকে একে একে শ্রদ্ধা জানাতে আসছে জনগণ। আইজেনস্টাইন ইচ্ছে করেই ভাকুলিনচুককে ছবির অনেকটা অংশ জুড়ে অদৃশ্য করে দেন। এতে বোঝানো হয়—

বিপ্লব কোনো এক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, ব্যক্তি মরে যেতে পারে, কিন্তু বিপ্লবী চেতনা বেঁচে থাকে।

আজ শতবর্ষে পৌঁছেও তাই ব্যাটেলশিপ পোটেমকিনের প্রাসঙ্গিকতা বিন্দু মাত্র কমেনি। ১৯২৯ সালে লন্ডনে এই ছবি প্রথম প্রদর্শিত হলে লন্ডনের চলতি সংবাদপত্রে এই ছবিকে ‘সোভিয়েত প্রোপাগান্ডা’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বলাই বাহুল্য এই ছবি বিশ্লেষণ করার জন্য যে প্রজ্ঞা প্রয়োজন ছিল তা তাদের আয়ত্তে ছিল না। আইজেনস্টাইন এবং তাঁর এই অমর সৃষ্টি রাজনৈতিক এবং বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের উদাহরণ হিসাবে বিশ্ব-শিল্পের ইতিহাসে থেকে যাবে আরও একশো বছর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *