ইতিহাসের জন্য, বইয়ের জন্য — সব আমাদের জন্য

সেদিন নির্বাচিত ছাত্রসংসদ থাকলে কী হত, আদৌ এত অনায়াস হত কিনা, আমি জানি না; কিন্তু এটুকু জানি যে, লাইব্রেরি খোলাই থাকুক অথবা বন্ধ—দুই ক্ষেত্রেই ছাত্রসংসদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকত। আজ থেকে প্রায় দু-দশক আগে এসএফআই পরিচালিত ছাত্রসংসদের যেমন জ্ঞানকে মুক্ত রাখার পক্ষে সদর্থক ভূমিকা ছিল।

কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাস। আশুতোষ বিল্ডিং। দোতলা। বাংলা ডিপার্টমেন্ট। পোশাকি নাম—বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বিভাগ। ডিপার্টমেন্টাল লাইব্রেরি। তালাবন্ধ। আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের চিচিং বন্‌ধ্‌।

সেন্ট্রাল লাইব্রেরির উলটোদিক দিয়ে ঢুকে ডানহাতের যে-সিঁড়ি উঠে যায় দোতলায়—বাংলা ডিপার্টমেন্টে, ডিআরএস রুম আর টিচার্সরুমের মাঝে ছিল সেই লাইব্রেরি; শশিভূষণ দাশগুপ্ত এবং আরও অনেকের উদ্যোগে সংরক্ষিত বহু পুথি সযত্নে রাখা ছিল যেখানে; আর ছিল বই : ওখানে বসেই পড়তে হত, বেরোনোর সময় জমা দিয়ে যেতে হত, আর-পাঁচটা লাইব্রেরির মতো বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। যে-ঘরটিতে অথচ ছয় থেকে আট বছর কোনও ছাত্রই প্রবেশের অধিকার পায়নি, বই হাতে নিয়ে দেখা/পড়া তো দূর কি বাত।

আমরা যখন ভর্তি হই ইউনিভার্সিটিতে, সবে সপ্তমবারের জন্য রাজ্যের তখ্‌ত্‌-এ-তাউসে চড়ে বসেছে বামফ্রন্ট, কলেজ স্ট্রিট-সহ সবক-টি ক্যাম্পাসেরই ছাত্রসংসদ পরিচালনা করছে এসএফআই। সেন্ট্রাল স্ট্যান্ডিং কমিটিও—কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ—তার ব্যতিক্রম নয়।

আমরা ক্লাস করি অথবা করি না, রাখালদার ক্যান্টিন কিংবা ইউনিয়ন রুমে যাই, ছাত্রভবনে ক্যারম বা টেবিল টেনিস, নিদেনপক্ষে ব্যাঙ্ক-লাগোয়া শানবাঁধানো মেঝেতে ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন, বাংলা ডিপার্টমেন্টের টিচার্সরুমের পাশের ঘরটিতে তালা ঝোলে। আমাদের মতো বিবর্ণ কয়েকজন, যারপরনাই কৌতূহলী, ওই বিভাগেরই বয়স্ক এক কর্মীর থেকে অবিকল জেনে গেলাম ঘরটির যাবতীয় ইতিহাস ও বর্তমান। ভবিষ্যৎ জানতে তখনও কিছু দেরি ছিল।

অতঃপর কথা এগোল। ক্যান্টিনের টেবিল থেকে এসএফআইয়ের ইউনিট হয়ে ইউনিয়নের ডাকা অল-সিআর—ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ, যে-শব্দবন্ধ আজকাল ডোডোপাখির মতোই ঠেকে অনেকের কাছে—মিটিং। মিটিং থেকে ছড়িয়ে যাওয়া ক্লাসরুমের ডায়াসে, ডায়াস থেকে নেমে-আসা প্রতিটি বেঞ্চে। ভূমিকম্পের পর অনেকক্ষণ ধরে কাঁপতে থাকে মাটি, আমরা খেয়াল করছিলাম, এখানে সে-কম্পন জাগছে আগেই : ‘বৃশ্চিক রাশির নীচে যে মানুষ শুয়ে আছে ভাষাহীন, কপর্দকহীন, তাকে দাও রূপকথা, তাকে দাও যথার্থ মনীষা।… জাগো ভবিষ্যৎ।’

লাইব্রেরি খোলার দাবিতে, বুঝি-বা পাঠশালা খোলার অদম্য প্রত্যয়ে, নিজেদের তাগিদে এবং অবশ্যই স্টুডেন্টস’ ইউনিয়নের আহ্বানে ক্লাস ছেড়ে করিডোরে বেরিয়ে এসেছিলাম আমরা—সব ছাত্ররা; শুরুর দিকের ছোটো-ছোটো স্কোয়াডগুলোও দ্রুত বদলে গেল ঘেরাওয়ে। পরপর দু-দিন ঘেরাও হলেন আর্টস ও কমার্স ফ্যাকাল্টির সেক্রেটারি। এর কিছুদিন পরেই ইউনিভার্সিটিতে ভোট—সেনেট-সিন্ডিকেটের নির্বাচন। ততদিনে নতুন বছর পড়ে গেছে; যে-বছরের দ্বিতীয় দিনেই উদ্ধার হয় নন্দীগ্রামে কর্তব্যরত পুলিশকর্মী শঙ্কর সামন্তর লাশ। মাস দুয়েক পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিল্পায়নের দাবিতে বামপন্থী ছাত্রদের মিছিল, ছাত্রসংসদ নির্বাচন, পার্ট ওয়ান এবং টু—পরীক্ষা। একটা ব্যাচ বেরিয়ে যাচ্ছে, নতুন ব্যাচ ঢুকছে আর ক্যাম্পাসের দেয়ালে তখন ফুটে উঠছে লালরঙা অক্ষর : ‘নীতির প্রশ্নে কোনও মধ্যপন্থা হয় না’। নিচে স্ট্যালিনের নাম। যারা সদ্য প্রাক্তন, নবীনের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছে রিলে রেসের ব্যাটন—পাঠশালা একদিন খুলবেই!

ডিপার্টমেন্টাল লাইব্রেরি খোলার দাবিতে যে-আন্দোলন, আর-যে শুধু রাস্তায় থাকল না, তা সেনেট-সিন্ডিকেটে নির্বাচিত ছাত্র-প্রতিনিধিদের বদৌলত; রাজ্যে পালাবদলের পর গণতান্ত্রিক যে-কাঠামোকে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই। বস্তুত, তারপর থেকে সেনেট-সিন্ডিকেটে বোধহয় আর কোনও নির্বাচন হয়নি, ছাত্র-প্রতিনিধিদেরও স্থান সংকুলান হয়নি।

লাইব্রেরি খোলার লড়াই এবার যুগপৎ—ঘরে এবং বাইরে। এই দ্বিমুখী আন্দোলন সত্ত্বেও একটা বছর পেরিয়ে যায়। আশুতোষ বিল্ডিং থেকে ঘেরাও ততদিনে চলে এসেছে দ্বারভাঙা বিল্ডিংয়ে। রেজিস্ট্রার থেকে ভাইস চ্যান্সেলর—বাদ যাননি কেউই। আরও একটা ব্যাচ তাদের ফাইনাল পরীক্ষার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তার দু-আড়াই মাস আগে স্টুডেন্টস’ ইউনিয়ন ইলেকশন, যে-সিন্ডিকেট একদিন বন্ধ করে দিয়েছিল ডিপার্টমেন্টাল লাইব্রেরি, সেই সিন্ডিকেটই পাঠশালা খোলার পক্ষে এসে দাঁড়াল। ডিপার্টমেন্টাল লাইব্রেরির নাম শুধু বদলে হল সেমিনার লাইব্রেরি। নতুন একজন কর্মীকে বদলি করে আনা হল বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে। এক শনিবার দুপুরে, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক—সেই সময় আমাদের ক্যাম্পাসে ক্লাস নিতে আসতেন—এবং বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের উপস্থিতিতে তালা খুলল, প্রদীপ জ্বলল। ভিতরে তখন নতুন বইয়ের গন্ধ।

কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর সংগ্রহ থেকে বিভাগকে বেশকিছু বই দিয়েছিলেন, বন্ধ হওয়ার আগে যেগুলো রাখা ছিল এই লাইব্রেরিতে। তৎকালীন যে-কর্মচারী লাইব্রেরির দেখভাল করতেন, জনশ্রুতি এই যে, প্রায়দিনই ছুটির সময় লুকিয়ে-চুরিয়ে দু-একটি বই নিয়ে তিনি বেচে দিতেন কলুটোলায়—পুরোনো বইয়ের দোকানে। একদিন কোনও-একজন পাঠকের হাতে শঙ্খবাবুর স্বাক্ষরিত একটি বই পড়ে এবং তিনি সেটি নিয়ে পৌঁছে যান হাডকো মোড়ে। এই ঘটনার রেশ ধরে তৎকালীন সিন্ডিকেট এক আজব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল : চোরের উপর ব্যবস্থা না-নিয়ে চুরির যোগ্য যা-কিছু, তাদের সরিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় দরজায়!

ভবিষ্যৎ জানতে তখনও কিছু দেরি ছিল আমাদের!

এই ঘটনার বেশ কয়েক বছর পরের ঘটনা। ইউনিয়ন রুম দখল হয়ে গেছে ততদিনে, ছাত্রসংসদ নির্বাচনেরও নাম-গন্ধ নেই কোনও, সেই সেমিনার লাইব্রেরি নিজেকে বদলে ফেলল সেমিনার রুমে; যে-ঘরে অধ্যাপকদের উজ্জীবন হেতু পাঠমালা চলবে, ছাত্রদের বই পড়ার তত প্রয়োজন নেই। পাঠশালা, অতএব, বন্ধ।

সেদিন নির্বাচিত ছাত্রসংসদ থাকলে কী হত, আদৌ এত অনায়াস হত কিনা, আমি জানি না; কিন্তু এটুকু জানি যে, লাইব্রেরি খোলাই থাকুক অথবা বন্ধ—দুই ক্ষেত্রেই ছাত্রসংসদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকত। আজ থেকে প্রায় দু-দশক আগে এসএফআই পরিচালিত ছাত্রসংসদের যেমন জ্ঞানকে মুক্ত রাখার পক্ষে সদর্থক ভূমিকা ছিল।

One thought on “ইতিহাসের জন্য, বইয়ের জন্য — সব আমাদের জন্য

  1. তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন নিয়ে আমার বলার কিছু নেই।লেখাটা ভাল।তবে তথ্য পরিবেশনে আরও একটু যত্নবান হতে হবেএকটা জায়গায় উল্লেখ করা ততদিনে নন্দীগ্রামে উদ্ধার হয়েছে পুলিশ কর্মী শঙ্কর সামন্ত র লাশ। ভুল। শহীদ শঙ্কর সামন্ত পুলিশ কর্মী ছিলেন না।উনি ছিলেন স্থানীয় গ্ৰাম পঞ্চায়েতের সিপিআইএম সমর্থিত বিজয়ী প্রার্থী। কমরেড সামন্তকে২০০৭সালের ৭ই জানুয়ারি গ্ৰামেই প্রথমে কুপিয়ে তারপরে জীবন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
    কমরেড অনির্বাণ আপনি মনে হয় রাজ্য পুলিশের অত্যন্ত দক্ষ গোয়েন্দা কর্মী সাধু চরন চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলেছেন। ওনার বিকৃত দেহ হলদী নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *