বাংলাদেশ : “আর কত রক্তের দরকার হবে?”
ময়ূখ বিশ্বাস
৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট মুজিবকে সপরিবার খুনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন রাজাকার, পাকিস্থানপন্থী শাহ আজিজকে। তার নির্দেশেই প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ পায় নিষিদ্ধ সংগঠন গোলাম আজমের জামাত-ই ইসলাম। সংক্ষেপে জামাত। জামাতের যুদ্ধাপরাধের দায় ও তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা ইতিহাসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। অথচ স্বাধীনতার বহু বছর পরও দল হিসেবে তাদের নিষিদ্ধ না করা এবং বিচার না করে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম বেঈমানি। যে দল সরাসরি পাকিস্তানের দালালি করেছে, বাঙালিদের হত্যা করেছে, এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের জন্য গণতান্ত্রিক সুযোগ রেখে দেওয়া ছিলো শহীদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার হিসেবে এটি চরম নীতিহীনতার পরিচায়ক।
সত্তরের দশকের শুরুতে গোটা পৃথিবীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই। ধর্মের ভিত্তিতে যে পূর্ব ও পশ্চিমের দুটো প্রান্ত নিয়ে পাকিস্তান তৈরী হলো, সে দেশ পুরোটা টিকলো না। ৩০ লক্ষ মানুষ ভাষার জন্যে, স্বাধীনতার জন্যে জান দিলো। পাকিস্তান সেনা ৪ লক্ষ বাঙালী মহিলাকে ধর্ষণ করেছিলো। গোটা পৃথিবী স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলো এই নির্মমতা দেখে। সেটা ছিলো গোটা জাতকে মুছে দেওয়ার ব্লু-প্রিন্ট। পাকিস্তানের পাশে ছিলো আমেরিকা, ব্রিটেন ও ন্যাটো। অন্যদিকে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের সাহায্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ভারতের সরকার। সীমানা খুলে দিয়ে সাহস জুগিয়েছিল ভারত। পাশে কাস্তে হাতুড়ি তারা খচিত নিউক্লিয়ার সাবমেরিন নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো কমিউনিস্ট দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন থেকে যুদ্ধের রসদ জোগানো – করেছিল ভারতের বামপন্থীরা। কিন্তু সে তো ইতিহাস। উল্টোপুরাণ শুরু হলো জুলাই’২৪ থেকে কোটা সংস্কার দাবিতে চলছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের শাসনে বিপুল দুর্নীতি ও ভোট লুটের অভিযোগে মানুষের ক্ষোভ ছিলোই। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সিংহভাগ দায় হাসিনার। তার দল। তার সরকারের। কারণ শাসকের দায় সবচেয়ে বেশি। ছাত্রছাত্রীদের সাথে প্রকৃত আপা’র মত ব্যবহার না করে যিনি পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছেন। ছাত্রলীগকে খুল্লমখুল্লা মস্তানির লাইসেন্স দিয়েছেন। অহমিকা দেখিয়েছিলেন। সে সময় বাংলাদেশে পুলিশের গুলিতে ছাত্র খুনের ঘটনায় আবেগের স্রোত বইল এ বাংলায়। যেটা স্বাভাবিক, ন্যায্য ও মানবিক। কিন্তু, তাকে সরিয়ে যে মোল্লাতন্ত্রের আবির্ভাব হয়েছে – সেই ঘটনাকে আর যাই হোক ‘বিপ্লব’ বলা যায়না। সেই সময় প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন বলেছিলো, বাংলাদেশ সরকার সমস্যার সমাধানে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর যে প্রশাসনিক দমনপীড়ন করেছে তার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা করছে এবং ধিক্কার জানাচ্ছে কোটা – সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি অত্যাচার ও গুলিচালনার ঘটনাকেও। গুলিচালনার ঘটনায় নিহত ছাত্রদের পরিবার এবং তাদের সহপাঠী – বন্ধুদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেছিলো ভারতের ছাত্র ফেডারেশন। কারণ সবসময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তথা শান্তিপূর্ণ জমায়েত বা আন্দোলনের অধিকার রক্ষার প্রতি পূর্ণসংহতি জানায় ভারতের ছাত্র ফেডারেশন। কিন্তু এরসাথে এটাও স্পষ্ট করে বলা হয় এসএফআই কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে যে, “দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা কখনোই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি চাই না। আমরা চাই না, এই সুযোগে এই আন্দোলনকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকরা দক্ষিণ এশিয়ার, বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিক, বাধ্য করুক দেশগুলিকে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ নীতি তৈরি করতে। গঙ্গার এপার হোক বা ওপার এই বিষধর শক্তিগুলির মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা নিতে হবে আমাদেরকেই।” দেখা গেল এসএফআই-এর আশঙ্কাই সত্যি হলো। কোটা আন্দোলনের গুড় খেল আদপে জামাতের মতো মৌলবাদী, তীব্র ভারত বিরোধী এবং তাদের চালক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা। যা একটার পর একটা ঘটনাক্রমে স্পষ্ট। অপরদিকে সরকার বিরোধী আন্দোলনের রাশ শ্রীলঙ্কায় বামপন্থীদের হাতে থাকায় সেখানে সাম্রাজ্যবাদ ট্যা-ফু করতে পারেনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নেপালে বামপন্থী সরকারের যে দুর্নীতি প্রবেশ করেছিলো, তার সুযোগ সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে ‘জেন-জি’ আন্দোলনে রূপ দিতে চাইলেও, সংগঠিত ভাবে ওখানকার কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো দ্রুত আন্দোলনকারীদের দাবী শুনে, ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আস্তে আস্তে। এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, কোন দেশে এক চরম অস্থির ও উত্তাল পরিস্থিতিতে দুটো পরস্পর বিরোধী সম্ভাবনা ও আশঙ্কা থাকে। প্রথমটি গণতান্ত্রিক অগ্রগমন। অপরটি আরো রক্ষণশীল পশ্চাৎগমন।
🟥 সারা-পৃথিবী জুড়ে চলমান দ্বন্দ্ব-এর পরীক্ষাগার
সারাপৃথিবী জুড়ে মূলত চার প্রকারের দ্বন্দ্ব আমরা লক্ষ্য করতে পারি- (১) শ্রম বনাম পুঁজি (২) সাম্রাজ্যবাদের সাথে উন্নয়নশীল দেশগুলির দ্বন্দ্ব,
(৩) সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব, (৪) সাম্রাজ্যবাদ বনাম সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব।
আন্তর্জাতিক ফিন্যান্স পুঁজি নিয়ন্ত্রিত ধনতান্ত্রিক দেশগুলি পুঁজিপতিদের মুনাফার স্বার্থে পৃথিবীজুড়ে সাম্যের ধারণার বিরোধিতায় বারেবারে বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং করেই যাচ্ছে ভেনেজুয়েলা থেকে ইয়েমেনে, বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে গণঅভ্যুত্থানের নামে সেই দেশটির সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করে তাকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মধ্যে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, যেমনটা ইরাকে বা লিবিয়াতে হয়েছে। মানবিক অজুহাতে মানুষ মারার খেলায় নেমেছে তারা। অশান্ত করার চেষ্টা করেছে পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে রঙ্গিন বিপ্লবের নামে বা ‘আরব বসন্ত’ এর নামে আরবে। এখনো সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাভাবনাকে চরিতার্থ করতে গিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা, ইউক্রেন এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিরন্তর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা-যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কিউবাকে অমানবিক অবরোধ করে রেখেছে প্রায় সাত দশক ধরে। আর ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশ যখন চীন এবং রাশিয়ার পক্ষে নিজেদের বৈদেশিক নীতি প্রণয়ণ করতে যাচ্ছিলো, তখন এই নীতিকে সাবোটেজ করার উদ্দেশ্য নিয়ে, দক্ষিণ এশিয়াতে প্রেশার পয়েন্ট তৈরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে আমেরিকা বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিলো।
জামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি বাংলাদেশে বহু দিনের। কিন্তু হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে এই কাজে ঢিলেমির অভিযোগ রয়েছে মুক্তমনা রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মীদের। হাসিনা সরকারের যুক্তি ছিল, নিষিদ্ধ করলে মৌলবাদী জামাত চোখের আড়ালে চলে যাবে। এই জামাত-শিবিরের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক খুবই কাছের। আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা জামাতকে তালিবানের চেয়ে উন্নত ইসলামি শক্তি বলে সওয়াল করেন। জামাতের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের ফাঁসির আদেশ রদ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে তদবির করেছিলেন আমেরিকার তৎকালীন বিদেশসচিব হিলারি ক্লিন্টন। হাসিনা তাতে আমল না দেওয়ায় হুমকি দিতেও শোনা গিয়েছিল হিলারিকে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, ২০২৩ এর অক্টোবর মাসের শেষদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বাংলাদেশের নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তীতে সারা দেশ জুড়ে সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ড আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে বি.এন.পি এবং জামাতের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় বসেন। এই বিষয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা ২০২৩ এর ডিসেম্বর মাসেই বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক করে বলেছিলেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আমেরিকা ও পশ্চিমী দেশগুলি বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সহ আরো তীব্র মাত্রায় সরকারের উপরে চাপ প্রয়োগ করবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে, আরব বসন্তের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে বাংলাদেশের সরকারকে অগণতান্ত্রিকভাবে অপসারণ করা হবে এবং শাসনক্ষমতার দখল নেবে মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিনিধিরা। একদম হলোও তাই। কর্তা হয়ে বসলেন, গরীবের টাকা লুটকারী গ্রামীণ ব্যাংকের সর্বময় কর্তা তথা সাম্রাজ্যবাদের গিফট ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ প্রাপ্ত মহম্মদ ইউনূস।
সেই কোটাবিরোধী আন্দোলনে অতিদ্রুত যে সংগঠিতভাবে হিংসাত্মক রূপ ধারণ করেছিলো এবং নিজেদের দাবিগুলি থেকে সরে গিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপান্তরিত হলো, সেটা কোথাও একটা রাশিয়ার সতর্কতার ইঙ্গিত দেয়। আমাদের স্মরণে আছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চেয়েছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন। একইসঙ্গে কব্জায় আনতে চেয়েছিল ভারতকেও। তৎকালীন সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপে ওরা সাময়িক পিছু হটে। আবার ১৯৭১ এর মতই বঙ্গোপসাগরে কড়া নাড়ছে নানা দেশ আর তাদের ইন্টারেস্ট। ইতিমধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর এখন নেই সেই সোভিয়েতও। বরং পৃথিবীজুড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপ করে দেশগুলির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করে তা সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করার মার্কিন ও ইউরোপীয় ছক রয়েছেই। এই সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব সম্পর্কে আমরা সতর্ক না হলে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ না গড়ে তুলতে পারলেই বিপদ।
🟥 রাজাকারদের রি-এন্ট্রি
৩০ লক্ষ শহীদ, লাখ লাখ মা- বোনেদের ধর্ষিত-লাঞ্ছিত হওয়ার বিনিময়ে, মুক্তিযুদ্ধের ফসল হিসেবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেয়েছিলো। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ মানে কিন্তু সেটা একটা পরিবারের মুক্তিযুদ্ধ ছিল না। একজন মুজিবরও নয়, আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভাগ ছিল লক্ষ মুজিবরের কন্ঠে। এই মুক্তিযুদ্ধের মাটি বাংলাদেশে “আমি কে? তুমি কে? রাজাকার, রাজাকার”- এই স্লোগান যখন ওই আন্দোলনে উঠলো, তখন বোঝা উচিত ছিলো ‘ডাল মে সব কুছ কালা হ্যায়।’ মুক্তিযুদ্ধের ভুল ধারণার বিরোধী এবং একইসঙ্গে শাহবাগ আন্দোলনেরও ঐতিহ্যের পরিপন্থী শক্তির এ ছিলো পুনরায় ক্ষমতার অলিন্দের স্বাদ পাওয়ার মতো। ঐ দেশের ভিতরে রাজাকার, মৌলবাদী তথা পাকিস্তান সমর্থক চিরকালই ছিল এবং সেইসব গোঁড়া মৌলবাদী জেহাদীরা তীব্রভাবে ভারতবিরোধীও ছিল। আন্দোলনের আগে থেকেই ঢাকায় বিভিন্ন পশ্চিমী দেশের দূতাবাসে জামাত, হিফাজতের নেতাদের যাতায়াত ছিলো। সেই হিফাজত, যাদের ইশতেহারে ঘোষণা হয়েছিলো, হাসিনা সরকার পতনের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে খুন করা হবে আওয়ামি লিগের নেতা, শাহবাগ আন্দোলনের কারিগর এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের। যে মৌলবাদের হাতে খুন হতে হয়েছিল মুক্তমনা ব্লগার অভিজিৎ রায়’দের। নাস্তিকতা যাদের কাছে অপরাধ। দুর্গাপুজোর সময়ে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করে এরাই। হাসিনার বড় অপরাধ, তিনি খালেদা ও তারেক জিয়াদের একঘরে করার জন্য একটা বড় সময় নীরবে প্রশ্রয় দিয়েছেন জামাতকেও। যার ফলশ্রুতি, ছাত্রলীগ ও আওয়ামি লিগের বিভিন্ন উচ্চপদে পুরোনো জামাতিরা টিকে গেছে। এরা ছিল ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে। তবু, হাসিনার আমলে অনেক কথা রেখেঢেকে বলতে হত।
৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট মুজিবকে সপরিবার খুনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন রাজাকার, পাকিস্থানপন্থী শাহ আজিজকে। তার নির্দেশেই প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ পায় নিষিদ্ধ সংগঠন গোলাম আজমের জামাত-ই ইসলাম। সংক্ষেপে জামাত। জামাতের যুদ্ধাপরাধের দায় ও তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা ইতিহাসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। অথচ স্বাধীনতার বহু বছর পরও দল হিসেবে তাদের নিষিদ্ধ না করা এবং বিচার না করে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে চরম বেঈমানি। যে দল সরাসরি পাকিস্তানের দালালি করেছে, বাঙালিদের হত্যা করেছে, এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের জন্য গণতান্ত্রিক সুযোগ রেখে দেওয়া ছিলো শহীদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার হিসেবে এটি চরম নীতিহীনতার পরিচায়ক।
যদি সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে হতো, তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু রাজাকারকে শাস্তি দিলেই হতো না – রাজাকারদের পৃষ্ঠপোষক দলগুলোর বিচার করাও সমানভাবে জরুরি ছিলো। তারফল যা হওয়ার তাই হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কথার কথা হয়ে থাকলো, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন ঘটলো না। আর এখন তো, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের শাখা সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞাই তুলে নিল বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
এখন মৌলবাদীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হতেই ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ নিয়ে সব স্মৃতি মুছে ফেলে, পাকিস্তানের মৌলবাদী ও ভাববাদী মেলবন্ধন করতে উদ্যোগী হয়েছে জামাত সহ এই বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তি। আক্রমণ করা হচ্ছে হিন্দু-বৌদ্ধ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। শুধু হাসিনা ঘনিষ্ঠ বা তাঁর সমর্থক আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মী নন, যে বামপন্থী পুরুষ ও মহিলা নেতা নেত্রীরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিলেন, হাসিনার বিরুদ্ধে ছিলেন আন্দোলনের সময় তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন, ইতিমধ্যে তাদেরও জেলে পাঠানো হয়েছে। এরা অনেকেই বৃদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। জেলে পাঠানো হয়েছে বহু মুক্ত মনা সমাজকর্মীকে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপাচার্যদের জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে।বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে চারটি স্বাধীন প্রাইভেট টিভি চ্যানেল। এগুলির মধ্যে অনেকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক ইত্যাদি দেখাত। পান থেকে চুন খসলেই- ফতোয়া ও তৌহদী জনতার হামলা। সমস্ত সংবাদ মাধ্যমের পলিসি পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে। না হলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। এমনকি হাসিনার ঘোর বিরোধী, জুলাই আন্দোলন সমর্থনকারী দেশের দুইটি সর্বাধিক বিশিষ্ট সংবাদপত্র প্রথম আলো এবং আরেকটি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর অফিস ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয়। সাংবাদিকরা মৃত্যুর মুখোমুখি হন। ইতিহাস আমাদের দেখায় যে কোন উগ্র মতবাদ, এই ধর্মীয় মৌলবাদ, ফ্যাসিবাদ কোনো বন্ধুকেই রেহাই দেয় না। আজকের মিত্ররা আগামীকালের শিকার হতে পারে এদের। সেদিন মধ্যরাতে নিউ এজ-এর নুরুল কবির আক্রান্ত হন। খুলনায় এক সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি ছিলেন খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি।
আক্রান্ত হচ্ছে ছায়ানট, উদীচীর মতো প্রগতিশীল সংস্কৃতি কেন্দ্র। ছায়ানট নজরুলের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থেরও শিরোনাম – ‘ছায়া’ ও ‘নট’ থেকে গৃহীত। পাকিস্তান শাসনে জেনারেল আয়ুব খানের আমলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সব কাজ নিষিদ্ধ থাকলেও ১৯৬১ সালে (এখন যেমন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেও নিষিদ্ধ হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ), পাকিস্তানি শাসনের হুমকিকে উপেক্ষা করে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করা হয় এবং সেই মুহূর্ত থেকেই ছায়ানটের জন্ম। এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নয়, বাঙালির ঐতিহ্য ও পরিচয়ের প্রতীক। বাংলার মাটিতে রবীন্দ্র-নজরুল, বাউল-ভাটিয়ালির সুর বহন করে এসেছে এই সংস্থা। ছায়ানটের নববর্ষ উৎসব এখন ইউনেস্কো স্বীকৃত। তবু এমন একটি শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠানও মৌলবাদী দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি ও বই পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বেশিরভাগ সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়। উন্মত্ত জনতা হারমোনিয়াম ভেঙে দেয়, সাততলা ভবনের প্রতিটি কক্ষে তাণ্ডব চালায় এবং চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ – যা পায় তাই ভেঙে চুরমার করে। ছায়নট প্রতিষ্ঠার আট বছর পর, বিপ্লবী লেখক সত্যেন সেন ও রনেশ দাশগুপ্ত উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী গঠনের নেতৃত্ব দেন। প্রতিষ্ঠার পর, সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উজ্জীবিত কর্মী ও কর্মীরা গ্রাম, মাঠ, নদীতীর জুড়ে বাংলার গণসংগীতের ঝড় তুলেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়, ছায়নট ও উদীচীর শিল্পীরা কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাদের কণ্ঠকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। স্বাধীনতার পরেও, ওই শিল্পীরা মৌলবাদী শক্তির বারবার আক্রমণের শিকার হন। ১৯৯৯ সালে, যশোর টাউন হলে উদীচীর একটি বাউল গানের অনুষ্ঠানে মৌলবাদীদের বোমা বিস্ফোরণে দশজন নিহত হন। যার মধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মী ও দর্শক ছিলেন। আবার ২০০১ সালে, রমনা বটমূলে ছায়ানটের নববর্ষ উদযাপনের সময়, মৌলবাদীদের বোমা হামলায় সাংস্কৃতিক কর্মী ও দর্শকসহ দশজনের প্রাণহানি ঘটে। এতো কিছুর পরেও তাদের সংকল্প ও মনোবল কখনও টলেনি।
🟥 মুক্তিযুদ্ধে এপারের বামপন্থীদের ভূমিকা
একসময়ের পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশের দুই বামপন্থী নেতা তথা মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য। তাদের একজন, হায়দার আকবর খান রনো তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন- “জ্যোতি বসু সর্ম্পকে কিছু লিখতে হলে অবশ্যই ১৯৭১ সালে তাঁর এবং তাঁর পার্টির ভূমিকার কথা স্মরণ করতেই হবে। সেই সময় ১ ও ২ জুন কলকাতার বেলেঘাটার এক স্কুলে কয়েকটি বামসংগঠন এক সম্মেলনের মাধ্যমে গঠন করেছিলো বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি। এই সংগঠনটি বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে মেনে নিয়েই দেশের অভ্যন্তরে স্বতন্ত্রভাবে যুদ্ধ করেছিল (ছোট বড় ১৪টি সশস্ত্র গেরিলা ঘাঁটি যাদের ছিল) এবং ভারতে অবস্থিত মুক্তিফৌজের ভেতরে থেকেও যুদ্ধ করেছিল। সিপিআই(এম) তাদের সংগৃহীত অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল। প্রধানত সাহায্য করেছিল বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের।” তিনি আরোও বলছেন,”প্রসঙ্গক্রমে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে একবার আমাকে ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার লোক আগরতলা থেকে ধরে নিয়ে শিলং এ নিয়ে যান। সেখানে ভারতের সামরিক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান জেনারেল সুব্রাহ্মনিয়াম আমাকে দুদিন ইন্টারোগেট করে পরে সসম্মানেই প্লেনে করে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। ঘটনাটি আমাকে বেশ বিচলিত করেছিল। কারণ কোন ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার সংস্পর্শ আমার পছন্দীয় নয়। কলকাতায় এসে বিষয়টি কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত ও কমরেড জ্যোতি বসুর কাছে বিবৃত করলাম। আমার মানসিক অবস্থা থেকে জ্যোতি বসু একটু হেসে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন “বিপ্লব করতে হলে তো কত রকম সংস্পর্শে আসতে হবে। এতে ঘাবড়ানোর কি আছে।” জ্যোতি বসু বলেছিলেন যে, “আমরা বাংলাদেশের বামপন্থীদের একমাত্র অস্ত্র দেয়া ছাড়া সবরকম সাহায্য করবো। কারণ অস্ত্রের বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের। অবশ্য একথা মনে করার কোন কারণ নেই যে, জ্যোতি বসু সংকীর্ণতাবাদী ছিলেন। তিনি সর্বপ্রথমে চাইতেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হোক। একই সঙ্গে অবশ্যই তিনি কামনা করতেন সঠিক লাইন গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের মাধ্যমে কমিউনিস্টরা সামনে আসুক। এটাই তো স্বাভাবিক।” আরেক নেতা রাশেদ খান মেনন এর ভাষায়, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বপ্রথম ভারতের বামপন্থীরাই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ভারতের অসংখ্য মানুষ আমাদের সহযোগিতা করেছেন, এমনকি বাংলাদেশের মুুক্তিযুদ্ধে জীবনও দিয়েছেন।” মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, “নরসিংদীর শিবপুরকে কেন্দ্র করে বামপন্থীরা মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ শুরু হয়েছিল। পরে ১৪টি স্থানে আমাদের ঘাঁটি ছিলো। মুক্তিযুদ্ধে প্রথম সহযোগিতা করেছিল ত্রিপুরার আগরতলা। সিপিআই(এম) এর ত্রিপুরা রাজ্য কমিটি দাবি তুলেছিল সীমান্ত খুলে দিতে হবে। এর ফলে সীমান্ত খুলে যায় এবং বাংলাদেশের যুদ্ধাক্রান্ত মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে পারেন। ভারতের বামপন্থীদের সহযোগিতার কথা জানতে পেরে এক কাপড়ে সীমান্ত পাড়ি ভারতে চলে গিয়েছিলাম। এখানকার বামপন্থী গ্রুপগুলিকে একত্রিত করে সিপিআই(এম) এর সহযোগিতায় কলকাতায় ‘বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। গণশক্তি, দেশের কথা ও আনন্দবাজার পত্রিকায় সে খবর প্রচারিত হয়েছিল। আমরা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সাথে দেখা করে সহযোগিতা ও ঐক্যবদ্ধ যুদ্ধের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের নির্দেশে বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের সহযোগিতা গ্রহণ করা যাবে না বলে আমরা তাঁর নিকট থেকে সহযোগিতার আশ্বাস পেলাম না।” “পরে ভারতের বামপন্থীদের বিশেষ করে সিপিআই(এম) এর সর্বাত্মক সহযোগিতায় আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি গড়ে যুদ্ধ করেছি। মার্কিনীরা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দিলে সিপিআই(এম) তার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তারা এতো সহযোগিতা করেছেন, কিন্তু তারা কখনো আমাদের নেতৃত্ব নিতে চান নি। সিদ্ধান্ত আমাদের, তারা সহযোগী। এই ছিল সিপিআই(এম) এর নীতি। এটিই কমিউনিস্ট আন্দোলনের শিক্ষা। দেশে দেশে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে এভাবেই নেতৃত্ব দিয়ে নয়, সহযোগী হিসেবে ভূমিকা নিতে হয়।” তিনি আরো বলেন,”বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম ও অর্জন বাংলাদেশের জনগণের। কিন্তু ভারতের বামপন্থীরা বিশেষ করে সিপিআই(এম) যে অকৃত্রিম সহযোগিতা করেছিলেন, তার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ।”
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বরেণ্য রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীসহ বিশিষ্ট নাগরিক এবং সংগঠনকে ২০১১ সালে প্রথমবার সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল। এর পরে আরো দুটি পর্যায়ে এই সন্মাননা দেওয়া হয় সম্মাননা প্রদান সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি’র পক্ষ থেকে তাঁদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে। এই তালিকায় একটি উজ্জ্বল নাম হলেন আমাদের নেতা, কমিউনিস্ট জ্যোতি বসু। তাঁর অবদানের বিষয়টি নিয়ে নীরবই ছিলেন জ্যোতি বসু। ২০১০ সালে কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতার প্রয়াণ হয়। তাঁর পরিবার মরণোত্তর এই সন্মান গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধে’র সময় ভারতের ছাত্র ফেডারেশনও মূল্যবান ভূমিকা পালন করেছিলো। হেলথ ক্যাম্প, রিফিউজি ক্যাম্প, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ সহ বিভিন্ন রকম সহযোগিতার মাধ্যমে। এটা আমাদের ইতিহাস। তাই আমরা কখনোই ওপারে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী রাজাকার বা জামায়তে ইসলামির এর মতো তীব্র সাম্প্রদায়িক দলের আস্ফালন বরদাস্ত করবো না। না বরদাস্ত করবো এপারে আরএসএসের দাদাগিরি।
🟥 জামাত-তৃণমূল-আরএসএস
পাঠকের মনে রাখা উচিত, এই জামাতের উদ্যোগেই এবং তৃণমূল নেতাদের সহযোগিতায় নির্বিঘ্নে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খাগড়াগড়ে এক তৃণমূল নেতার বাড়ি ভাড়া নিয়েই চলছিল বোমা বাঁধার কাজ। সেদিন এনআইএ থেকে সিবিআই বলেছিলো- হাসিনাকে মারতেই সে কারখানা তাঁরা খুলেছিলো। যাদের সিস্টার কনসার্ন ‘সিমি’র নেতাকে রাজ্যসভার সাংসদ বানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যারা লতায়পাতায় নানা নামে হাজির ছিল সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম পর্বে বামফ্রন্ট সরকার ফেলার ব্লু-প্রিন্ট তৈরির জন্য। ছিলো শুভাপ্রসন্নর রায়চকের বাগানবাড়িতে রামধনু জোটের সভায়। যেখানে উপস্থিত ছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমী দেশগুলোর দূতাবাসের টপ-বসেরাও।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারত একটা বড় ভূমিকা পালন করে আসতো। বহুক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের প্রতি বিগ ব্রাদার আমাদের বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে আখেড়ে ক্ষতিই করেছে। তবু আলোচনায় বসে পথ বাতলানো হত। আর এখন আরএসএসের শাসনে ভারত। কূটনৈতিক জগতে বাংলাদেশের পাশে থেকেও যারা অঙ্ক কষে ওপারে ইসলামি মৌলবাদ বাড়লে এপারে বাড়বে হিন্দুত্ব। সবচেয়ে বেশি লাভ এপার বাংলায়। তাই সে ভারতও নেই আর নেই জ্যোতি বসু। যে কোনও সংকটে অভিভাবকের মত পরামর্শ দিতেন যিনি।
🟥 তবু, আশা….
বৈষ্ণব ভক্ত, শ্রী চৈতন্যের শিষ্য ছিলেন অদ্বৈত আচার্য্য। তাঁর বংশজ, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় জন্মগ্রহণকারী দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা “ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা”তে আজোও মুখরিত হয় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। সেদিন যেমন হয়েছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ও। ছায়ানট ও উদীচী আক্রমণের পর হাজারে হাজারে শিল্পী সেদিন রাস্তায় নেমে এই গানগুলো গান। বাংলাকে বাংলাদেশি ভাষা বলা বা বাংলাদেশের বুকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার হনন করতে চাওয়া কোনও মৌলবাদী শক্তি এই ইতিহাস মুছতে পারবে না। এটাই আশার আলো।
তবে জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশ ও দুনিয়ার মানুষকে আরও একবার শিক্ষা দিয়ে গেল সঠিক রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনায় শাণিত নতুন এক ঐক্যবদ্ধ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির। যারা শাসককে আয়না দেখাবে। যারা বারবার শাসক সহ গোটা দেশকে মনে করাবে তোমার শেকড় কোথায়, স্বাধীনতার মানে। আজ দুই বাংলার সামাজিক প্রেক্ষাপট এখন অনেকখানি আলাদা হলেও কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থা যেন মিলেমিশে যাচ্ছে কোথাও। ধর্মের নামে উচ্ছন্নে যাচ্ছে লালনের জমিন। মানুষ মুক্তি চাইছে। আর তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে শাসক এবং অন্যান্য ক্ষমতালোভী রাজনীতির কারবারিরা। আশা রাখি উঠে দাঁড়াবেই একদিন বাংলাদেশ। যে যশোর খুলনা বাগেরহাটের কথা শুনেছি মামাবাড়ির দাদুর মুখে। যে দেশের প্রতি পরতে মিশে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ-জসীমউদ্দীন- সুফিয়া কামাল-শামসুর রাহমানরা। আশা রাখি, সে দেশ আবার নতুন করে ভাববে। ছক ভেঙে নতুন ছক গড়বে। মুক্তিযুদ্ধের আগুন বুকে নিয়ে, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলার স্বপ্ন আমরা এখনো দেখি। সেটা সম্ভব। তাই জোট বাঁধো। গণতন্ত্রের জন্য লড়ো। মৌলবাদকে ছুঁড়ে ফেলো। দুপারেই করতে হবে। এমন করে যাতে আর ১৯৫২ থেকে ২০২৫ অবধি যা চলেছে তেমন আর একজন ছাত্রকেও বুকে গুলি নিতে না হয়।