‘গ্যাংস্টার’ সাম্রাজ্যবাদ বনাম বিপ্লবী সমাজতন্ত্র, পক্ষ নিন
মাল্যবান গাঙ্গুলী
এই সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধেই যুদ্ধঘোষণা করেছে পেন্টাগন! দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ওদের মুনাফার জন্যে ছেড়ে দিতে হবে, সস্তা শ্রমিক পেতে শ্রমআইন বাতিল করতে হবে; নির্মূল করতে হবে সমাজতন্ত্রকে! দাঁত-নখ বের করে ফেলেছে ট্রাম্প এবং দুনিয়ার নিও ফ্যাসিস্ট ব্লক। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন, “We are going to run the country!” মাদুরোর অগণিত কমরেড রাস্তায় নেমেছেন প্রতিরোধে, ভেনেজুয়েলার উপ-রাষ্ট্রপতি ডেলসি রডরিগুয়েজ শিরদাঁড়া টানটান করে জবাব দিয়েছেন, এখনো ভেনেজুয়েলা মাদুরোর পথেই আছে, ভেনেজুয়েলা আছে সমাজতন্ত্রের পথেই। ওদের সংগ্রামের পাশে রয়েছে কিউবা সহ লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জনগণ। ভেনেজুয়েলার পাশে আছে তৃতীয় বিশ্বের সমস্ত মুক্তিকামী মেহনতি জনতা। আমেরিকা বলেছে, ওরা নাকি মাদুরোর বিচার করবে! আমরা বলছি, “ বিচারপতি, তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা!” মাদুরো ফিরে আসবেন, সমাজতন্ত্র জিতবেই!
মাঝরাত্রি! হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠলো কারাকাস, মিরান্ডা, আরাগুয়া, লা গুয়াইরা। পৃথিবীর গণতন্ত্রের তথাকথিত ঠাকুরদাদারা এক স্বাধীন, সার্বভৌম দেশে হামলা চালালো। এখানেই শেষ না, এরপরের পার্টটা খানিক থ্রিলার ফিল দেবে। একেবারে বেডরুম থেকে রাতের অন্ধকারে কিডন্যাপ করা হলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে, রক্ষা পেলেন না তাঁর স্ত্রীও, সৌজন্যে হোয়াইটহাউসের ‘গ্যাংস্টার’ ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিনেমা নয় কিন্তু, যদিও এই প্লট সিনেমাওয়ালাদের আগামী সৃষ্টির জন্যে লোভনীয় কন্টেন্ট হতেই পারে। মিরাফ্লোরেস-ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি ভবন, যা প্রায় একই রকম ঘটনার সাক্ষী থেকেছিল দুই দশক আগে। তখন প্রেসিডেন্ট উগো সাভেজ! আমেরিকা সেবারে পেছন থেকে সেনাঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার প্রতিবিপ্লবীরা লা আর্চিলা দ্বীপে যখন ফায়ারিং স্কোয়াডে খুন করতে উদ্যত সাভেজকে, সেই সময় ভেনেজুয়েলার রাস্তায় মানুষ উত্তাল! দেশপ্রেমিক ভেনেজুয়েলার তীব্র সংগ্রাম বাধ্য করেছিল সাভেজকে স্বমহিমায় কারাকাসের মাটিতে ফেরাতে! সাভেজের জাগ্রত উত্তরাধিকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো চোয়াল শক্ত করে এখন ট্রাম্পের বন্দীশালায়, হয়তো বিড়বিড় করছেন চিলির বিপ্লবী নেতা সালভাদোর আলেন্দে’র শেষ বক্তৃতার কথাগুলোই, “Placed in a historic transition, I will pay for loyalty to the people with my life. And I say to them that I am certain that the seed which we have planted in the good conscience of thousands and thousands of Chileans will not be shriveled forever.”
আমেরিকা অজুহাত প্রস্তুত রাখতে সিদ্ধহস্ত! সাদ্দাম হুসেনকে মারার জন্যে ওরা রাসায়নিক অস্ত্র মজুতের অভিযোগ তুলেছিল, সেই অস্ত্রের ‘অ’-টুকু পাওয়া যায়নি। নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে হোয়াইটহাউস অভিযোগ এনেছে নার্কো-টেররিজমের, অর্থাৎ মাদুরো মেক্সিকোর সিনালোয়া কার্টেল সহ বেশ কিছু গ্রুপের সাথে যৌথভাবে মাদক পাচার করছেন! এর ঠিক পরেই আগস্ট, ২০২৫-এ মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবৌম সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়ে দেন, মেক্সিকোয় তাঁর সরকারের কাছে নিকোলাস মাদুরোর সাথে সংযুক্ত কোনোরকম ক্রাইম নেটওয়ার্কের প্রমাণ নেই। হাস্যকর না? এখানেই শেষ না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের মাথার দাম ঘোষণা করেন ৩৮ মিলিয়ন পাউন্ড, যার থেকে ওসামা বিন লাদেনের মাথার দামও কম ধরা হয়েছিল! অথচ, হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্ডেজ একই অভিযোগে অভিযুক্ত, তিনি ট্রাম্পের চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সমর্থক হওয়ায় মার্কিন শিবির থেকে একাধিক সুবিধা পেয়ে চলেছেন। ট্রাম্প মাদক পাচারের অভিযোগ তুলে দিয়েছেন কলম্বিয়ার বামপন্থী নেতা গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধেও। আসলে কেউ ইয়াঙ্কি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেই তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করা হবে এবং তাঁকে নিকেশ করা হবে, এটাই ট্রাম্পের ফ্যাসিস্ট পলিসি।
‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’, ট্রাম্পের স্লোগান…অতীত গৌরব ফেরানোর নামে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মোড়কে সাম্রাজ্যবাদকে বৈধতা দেওয়ার নীতি! স্বপ্নাতুর অতীত গৌরব ফেরাতে ট্রাম্পের লোভাতুর দৃষ্টি লাতিন আমেরিকার দিকে! কিছুদিন আগে ভেনেজুয়েলা আক্রমণের প্রস্তুতিপর্বে যখন মাদক পাচার দমনের অজুহাতে ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সেনা নামালো আমেরিকা, সেই সময় পেন্টাগনের যুদ্ধসচিব পিটার হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেন, “With President Trump, we are going to reclaim our backyard.” ভেনেজুয়েলার আঞ্চলিক জলসীমার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয় আমেরিকার বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোল্ড, যা এতোদিন ব্যবহৃত হচ্ছিল গাজায় গণহত্যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে মাদক পাচার রোখার অভিযোগে ভেনেজুয়েলার আঠাশটি নৌযানের ওপর হামলা চালায় আমেরিকা, নিহত হয় প্রায় একশো জন। আর এই হামলার পরে হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডেল থেকে উচ্ছ্বসিত পোস্ট, “WE ARE HUNTING YOU!” এই অঞ্চলে মোট ১৫,০০০ সেনা মোতায়েন করেছে হোয়াইট হাউস শেষ কয়েক সপ্তাহে।
১৮২৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো লাতিন আমেরিকার ওপর তাঁদের অধিকারের কথা ঘোষণা করেন এবং ইয়োরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদী ব্লককে সতর্ক করেন যেন তারা লাতিন আমেরিকার দিকে না তাকায়। এই অধিকারবোধের উৎস কী? মার্কিন সেনাকর্তা লৌরা রিচার্ডসন জবাব দিয়েছেন সম্প্রতি, “বিশ্বের ৬০ শতাংশ লিথিয়াম এখানেই, ভারী ও হালকা উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেল রয়েছে, রয়েছে বিরল খনিজ উপাদান। এখানেই আছে আমাজন, যাকে বলা হয় বিশ্বের ফুসফুস। বিশ্বের ৩১ শতাংশ মিষ্টি জল এই অঞ্চলে।” লাতিন আমেরিকার প্রাকৃতিক সম্পদে তাই ওদের বাপের জমিদারি, দাবিটা খানিক এমনই! সাম্রাজ্যবাদের চাই বিনামূল্যে বিপুল কাঁচামাল, সস্তা শ্রমিক আর উন্মুক্ত বাজার, লাতিন আমেরিকার কাছে হোয়াইট হাউসের দাবি এটুকুই আর এই দাবি মেটাতে ওরা সব করতে পারে, সব! এই দাবি মেটাতেই ১৮৯৮ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে লাতিন আমেরিকায় ওরা ৪১বার প্রত্যক্ষ কিংবা অপ্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেছে। ১৯৭৩ সালে চিলিতে সালভাদোর আলেন্দের সমাজতান্ত্রিক সরকার উৎখাত ও পিনোচেতের নেতৃত্বাধীন পেটোয়া সরকারের মাধ্যমে তিন হাজার মানুষ খুন! কিউবা বিপ্লবের পর প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোকে অসংখ্যবার হত্যার পরিকল্পনা এবং অবৈধ অর্থনৈতিক অবরোধ! ১৯৮৯ সালে কুখ্যাত জর্জ বুশের নেতৃত্বে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পানামা আক্রমণ এবং সরকারের পতন! তারপর এই প্রথম ডিরেক্ট মার্কিন মিলিটারি অপারেশন…টার্গেট ভেনেজুয়েলা! ভেনেজুয়েলায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ তৈলখনি, প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল। সেই তুলনায় যথাক্রমে সৌদি আরবে ২৭০ মিলিয়ন ব্যারেল, ইরানে ২১০ বিলিয়ন ব্যারেল এবং রাশিয়ায় ৮০ বিলিয়ন ব্যারেল তেল সঞ্চিত রয়েছে। ইরাক কিংবা লিবিয়ার মতোই তাই ভেনেজুয়েলাও ওদের কাছে দীর্ঘমেয়াদী তেলের উৎস, বিপুল কাঁচামালের ভান্ডার, যা দখল করাই ওদের মূল উদ্দেশ্য!
১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার পতন ঘটলো। বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের কবর খোঁড়ার উদযাপনে লেখা হচ্ছিল ‘এন্ড অফ দ্যা হিস্ট্রি’, ঠিক সেই সময় মার্কিন দুনিয়া আইএমএফের মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশকে ঋণের জালে জড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির বুনিয়াদ নির্মাণ করছিল জর্জ বুশরা। ফিদেল সেই সাম্রাজ্যবাদের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম লড়ে যাচ্ছেন, পাশে পেলেন ভেনেজুয়েলাকে। ভেনেজুয়েলার শ্রমিক-মেহনতি জনতা উগো সাভেজের নেতৃত্বে পাশে দাঁড়ালেন সমাজতন্ত্রের। সমাজতন্ত্রের অর্থ, দেশের বিপুল সম্পদ থাকবে রাষ্ট্রের অধীনে, কোনো বহুজাতিক কর্পোরেটের মুনাফার স্বার্থে সেই সম্পদকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ভেনেজুয়েলার বিপুল তৈল সম্পদের রাষ্ট্রীয়করণ, এই ছিল বলিভারিয়ান সোশ্যালিজমের প্রথম পদক্ষেপ! তারপর থেকেই লাগাতার হয় আমেরিকার আগ্রাসন! ২০০২-র সেনা অভ্যুত্থানের পর ২০০৪ সালে গণভোটের মাধ্যমে উগো সাভেজের সরকার উৎখাতের চেষ্টা হয়, ব্যর্থ হয় দক্ষিণপন্থী মার্কিন মদতপুষ্ট রাজনীতি। ২০০৮ সালে পুনরায় সেনাঅভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চলে, ২০১২ সাল পর্যন্ত মোট ১৪ বার পেন্টাগনের যুদ্ধবিমান ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা লঙ্ঘন করে উস্কানি তৈরি করে। শুধুমাত্র সামরিক অভ্যুত্থান নয়, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নয়, ২০০২ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় বিভিন্ন মার্কিনপন্থী এনজিও সংস্থাকে আমেরিকার তরফ থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলারের বেশি আর্থিক সহায়তা করা হয় সমাজতন্ত্রবিরোধী প্রচারাভিযান সংগঠিত করতে। সব চেষ্টাই মাঠে মারা যায়, ২০১২ সালে ৫৫% ভোট পেয়ে উগো সাভেজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। ঠিক পরের বছর ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে অকালপ্রয়াণ ঘটে জননেতা সাভেজের, কঠিন সময়ে বলিভারিয়ান বিপ্লবের হাল ধরেন নিকোলাস মাদুরো! ২০১৩ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন মাদুরো, শুরু হয়ে যায় মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন সংবাদমাধ্যমের জঘন্য সমাজতন্ত্রবিরোধী প্রচার! ২০১৫ সাল থেকেই আমেরিকা ভেনেজুয়েলার ওপর অন্যায়ভাবে ৯৩০টি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ জারি করতে থাকে, নিষেধাজ্ঞা জারি হয় ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থার ওপর! ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির ওপর অভাবনীয় সংকট নেমে আসে, জাতীয় আয়ের ৯৯ শতাংশ হ্রাস পায়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকে ভয়ঙ্করভাবে! ২৩২ মার্কিন বিলিয়ন জিডিপি হ্রাস পায়। ভেনেজুয়েলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক জেসিকা ডোস সান্তোস একটি প্রতিবেদনে লিখছেন, হাই ব্লাড প্রেশার ও ডায়াবেটিসের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি ভেনেজুয়েলাকে ওষুধ দিতে অস্বীকার করে মার্কিন অবরোধের কারণে, সমস্যায় পড়েন ৩ লক্ষের বেশি রুগী। ভেনেজুয়েলায় CITGO প্রোগ্রাম লিউকেমিয়া সহ গুরুতর বিভিন্ন রোগে শিশুচিকিৎসার জন্যে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার খরচ বহন করতো, অর্থনৈতিক অবরোধে এই প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে যায়। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্যে কেমোথেরাপির মেশিন প্রস্তুতকারী সংস্থা Siemens, Electra বাধ্য হয় ভেনেজুয়েলাকে অসহযোগিতা করতে, ফলত ৯০% ক্যান্সার রুগীর চিকিৎসা আটকে যায়।
নিকোলাস মাদুরো মাথা নোয়াননি। সমাজতন্ত্র এই অবরোধ মোকাবিলা করেছে। চিকিৎসাক্ষেত্রের কথাই বলা যাক, ভেনেজুয়েলার ডাক্তাররা কম খরচে সমস্ত সরকারি হাসপাতালে শিশুচিকিৎসার অনন্য সার্জারি ও ট্রিটমেন্ট আবিষ্কার করেছেন। স্টেম সেল নিয়ে গবেষণায় অবিশ্বাস্য সাফল্য এসেছে, জন্মগতভাবে বিকলাঙ্গ শিশুর হাড় পুনর্গঠন, চোখ, ত্বকের চিকিৎসায় নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে, যা ২০২২ সালে কার্যকর হয়েছে গোটা দেশের সরকারি হাসপাতালে। রাশিয়ান প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন ইনসুলিন কারখানা তৈরি হয়েছে। ইরানের সাথে যৌথভাবে ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন নতুন যন্ত্রপাতি তৈরী হয়েছে ভেনেজুয়েলাতেই। আর্থিক মন্দা কাটিয়ে উঠে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছিল ভেনেজুয়েলা। ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ৫ থেকে ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। মুদ্রাস্ফীতির হার ব্যাপকভাবে কমে আসে। নিকোলাস মাদুরোর সরকার ৪০,০০০ হাজার নারী উদ্যোক্তাকে স্টার্টআপের জন্য লোন দিয়েছে এবং অর্থনীতিতে নারীদের ক্ষমতায়নের জন্যে ২ লক্ষ কমিটি তৈরি হয়েছে নারীদের প্রতিনিধিত্বে। ৮০ লক্ষ পরিবারের কাছে ভর্তুকিপ্রাপ্ত খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে, যে খাদ্যসামগ্রীর ৯৭ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন। আমেরিকার অন্যায় অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার বৈদেশিক বাণিজ্য বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। খাদ্যপণ্যে স্বনির্ভরতা ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকারি রিপোর্ট বলছে, একচেটিয়া পুঁজিকে রুদ্ধ করে ক্ষুদ্র উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭,৬৫৭ এবং ২০২৩ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩,০৯৬টি।
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এমতাবস্থায় ২০২২ সালে স্পেনের উগ্র বামবিরোধী দৈনিক পত্রিকা এল পাইস-এ এই অর্থনৈতিক উত্থানকে ‘বেপরোয়া পুঁজিবাদ’ বলে আক্রমণ করা হয়েছে। যে ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা শুরুর সময় থেকে ভেনেজুয়েলার সমাজতন্ত্রকে ‘বাতিল’ ঘোষণা করে এসেছে, তারাই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতপর্বে প্রতিবেদনের শিরোনাম লিখছে, “Can Venezuela help the West wean itself off Russian oil?” অর্থাৎ, ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক প্রতিরোধ স্বীকার করেছে পশ্চিমা দুনিয়া! এবার কথা হলো সমাজতন্ত্রের, নোবেলজয়ী মাচাদোদের নির্বাচনী প্রচারের পয়লা নম্বর পয়েন্ট ভেনেজুয়েলার সংবিধান পরিবর্তন। হুগো সাভেজ, নিকোলাস মাদুরোদের প্রণীত সংবিধানের ২৯৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষাই মূল লক্ষ্য। এখানে বলা হয়েছে, জাতীয় অর্থনীতির সুষম বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি পরিচালিত হবে। অর্থনীতি থাকবে সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ অংশগ্রহণ করবে মাত্র। সংবিধানে বলা হয়েছে, বাজারের অন্যায্য প্রতিযোগিতায় জাতীয় কৃষি ও শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্থ হতে দেওয়া যাবে না। এই সংবিধান অনুযায়ী তেল, সোনা, বিরল খনিজ রপ্তানি করে বৈদেশিক আয়ের উৎসের ওপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়েছে। জাতীয় বাজেটের প্রায় ৭০% সামাজিক-অর্থনৈতিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে ব্যয়বরাদ্দ করার অভিমুখেই হেঁটেছে ভেনেজুয়েলা। ভেনেজুয়েলার সমাজতন্ত্র এটাই, এই সমাজতন্ত্রের অর্থ সার্বজনীন শিক্ষা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যপরিষেবা, শ্রমিকদের পেনশন ও সরকারি বিমা, মাতৃত্বকালীন ছুটি। প্রসঙ্গত, সাভেজ যে শ্রম আইন লাগু করেছিলেন, তাতে শ্রমিকের সম্মানজনক ন্যূনতম মজুরি স্বীকৃত হয়েছিল। এই শ্রমআইন শ্রমিককে মজুরির জন্যে দর কষাকষি এবং ধর্মঘটের অধিকার দিয়েছে । অর্থনৈতিক সাম্য ও শ্রমিকের ব্যক্তিগত জীবনের যাবতীয় ভোগবিলাসের প্রয়োজনীয়তাকে সুনিশ্চিত করেছিল এই শ্রমআইন। নিকোলাস মাদুরো বিপ্লবী উত্তরাধিকার সূত্রেই এই শ্রম আইন ও দেশের সংবিধান বুক আগলে রক্ষা করেছেন।
এই সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধেই যুদ্ধঘোষণা করেছে পেন্টাগন! দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ওদের মুনাফার জন্যে ছেড়ে দিতে হবে, সস্তা শ্রমিক পেতে শ্রমআইন বাতিল করতে হবে; নির্মূল করতে হবে সমাজতন্ত্রকে! দাঁত-নখ বের করে ফেলেছে ট্রাম্প এবং দুনিয়ার নিও ফ্যাসিস্ট ব্লক। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন, “We are going to run the country!” মাদুরোর অগণিত কমরেড রাস্তায় নেমেছেন প্রতিরোধে, ভেনেজুয়েলার উপ-রাষ্ট্রপতি ডেলসি রডরিগুয়েজ শিরদাঁড়া টানটান করে জবাব দিয়েছেন, এখনো ভেনেজুয়েলা মাদুরোর পথেই আছে, ভেনেজুয়েলা আছে সমাজতন্ত্রের পথেই। ওদের সংগ্রামের পাশে রয়েছে কিউবা সহ লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জনগণ। ভেনেজুয়েলার পাশে আছে তৃতীয় বিশ্বের সমস্ত মুক্তিকামী মেহনতি জনতা। আমেরিকা বলেছে, ওরা নাকি মাদুরোর বিচার করবে! আমরা বলছি, “ বিচারপতি, তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা!” মাদুরো ফিরে আসবেন, সমাজতন্ত্র জিতবেই!
✊🏻