ঐতিহ্যের ৮৯, মতাদর্শের ৫৬

SFI 1st All India Conference

দেবাঞ্জন দে

মতাদর্শের শ্রেষ্ঠত্বে জন্মালো একটা পতাকা

ORGANISE TO RESIST – প্রতিরোধের জন্য সংগঠিত হওয়ার এই তাগিদ ছাত্রদের মগজে অনুভূত হয়ে এসেছে সেই পরাধীনতার সময় থেকেই। উনবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ডিরোজিও’র হাত ধরে তৈরি হয় ছাত্রদের টুকরো টুকরো কিছু লড়াইয়ের ল্যান্ডস্কেপ। তৈরী হয় সংগঠিত হওয়ার খিদে, তাগিদ। সেই তাগিদেই ছাত্র সংসদ, সেই তাগিদেই সংগঠন। সেই তাগিদেই বঙ্গভঙ্গের সময় ‘কার্লাইল সার্কুলারে’র বিরুদ্ধে কলেজ স্কোয়ারের বুকে ৩০,০০০ ছাত্রের জমায়েত। সেই তাগিদেই ১৯১৯ সালে রিপন কলেজে প্রথম ছাত্র সংসদ, সেই সংসদের ছড়িয়ে পড়া প্রেসিডেন্সি, স্কটিশ, সিটি কলেজে। সেই তাগিদেই জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকান্ডের পর শ্রদ্ধানন্দ পার্কে হাজার হাজার ছাত্র। সেই তাগিদেই গোটা দেশ জুড়ে ‘সাইমন গো ব্যাক’।

এরপর ১৯৩০’র দশকে পা দিলো ছাত্রসমাজ। দুনিয়া পা রাখলো এক ভয়াবহ দুশমনের সামনে। এল ফ্যাসিবাদ , এল ইতালির মুসোলীনি থেকে জার্মানির হিটলার। ফ্যাসিবাদের কালো ঘোড়া তার সেরা জকিদের নিয়ে লাগালো মারকাটারি দৌড়। রেস কোর্সের ব্যালকনিতে ভীড় জমালো দুনিয়ার তাবড় বড়লোকেরা। এই ফাটকার মার্কেটে ফিরে ফিরে এলো সেই বজ্রনির্ঘোষ– ‘ORGANISE TO RESIST’ : সাম্রাজ্যবাদের ডাম্পিং জোনগুলোর স্বাধীনতার লড়াইকে পরিণত করল ফ্যাসিবাদবিরোধী দুর্গে। ব্যাপক অংশের মানুষকে সংগঠিত করল লড়াইয়ের ময়দানে। ডিমিট্রভের ডাকে সাড়া পেল গণসংগঠনের ভাবনা– ১৯৩৬ সালে ১২ই আগস্ট লখনউতে পথ চলা শুরু করলো সংগঠিত ছাত্র আন্দোলন। তারপর বিশ্বযুদ্ধ, ফ্যাসিবাদের সেই টগবগানো ঘোড়া মুখ থুবড়ে পড়ল মানব ঐক্যের ব্যারিকেডের সামনে। 

স্বাধীনতা, শান্তি, প্রগতির পতাকাকে সামনে রেখে এগোল এদেশের সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনের ধারা। যার ধমনীতে ফ্যাসিবিরোধী রক্তের জোয়ার। স্বাধীনতার লড়াই তীব্রতর হওয়ার সাথেই জুড়তে থাকলো দেশ গড়ার আহ্বান। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারত রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিলেও, দিলো না অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। বৈষম্যের দেশে ছাত্র আন্দোলনের ধারা চললো শ্রেণী অভিমুখ ধরে। প্রত্যাশার বিস্ফোরণের সামনে সরকার বাহাদুর কেড়ে নিতে থাকলো ভাত, কাপড়, লেখাপড়ার, গণতন্ত্রের অধিকার। স্বাধীন দেশের প্রথম দশক সাক্ষী থাকলো রাজপথ তোলপাড় করা একের পর এক ছাত্র আন্দোলনের। চিন্তা, চেতনায় সেই ‘Organise to Resist’ । বাংলায় ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতনবৃদ্ধির জন্য আন্দোলন, দু’পর্বের খাদ্য আন্দোলন, রেশনের জন্য আন্দোলন, শিক্ষাসামগ্রীর জন্য আন্দোলন। আবার তার পাশাপাশিই ভিয়েতনামের সংগ্রামী জনতার প্রতি সংহতির আওয়াজ- “আমার নাম, তোমার নাম, ভিয়েতনাম”। ম্যাকনামারার বিমান আটকানো যৌবন তখন জেনারেল কারিয়াপ্পার সামনে চোখে চোখ রেখে বলতে শিখছে “Yes, I am a Communist!” মতাদর্শের আগুনে সেঁকে নেওয়া মন, মগজে তখন সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে তিল তিল করে। 

তীব্র মতাদর্শগত সংগ্রামের রাস্তা ধরেই সংশোধনবাদ, সংকীর্ণতাবাদের বিচ্যুতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথে গড়ে উঠেছে ছাত্রসংগ্রাম। পাতার পর পাতা মতাদর্শের বিচ্ছুরণে শাণ দেওয়ার আন্দোলনের ধারায়। তার চার বছরের মধ্যে, ২৭-৩০শে ডিসেম্বর, ১৯৭০ সালে কেরলের ত্রিবান্দমে গোটা দেশ থেকে সম্মিলিত হওয়া প্রতিনিধিদের আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে আত্মপ্রকাশ হলো নতুন পতাকার, স্লোগানের- স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র। গড়ে উঠলো মতাদর্শে বলীয়ান গোটা দেশব্যাপী সংগঠন। সংগঠনের জন্ম সেই ১৯৩৬, ‘৭০র ৩০শে ডিসেম্বরে জন্ম নিলো পতাকা, সংবিধান, মতাদর্শের সূচীমুখ আর রাজনীতির প্রায় দু’শো বছরের ইতিহাসের সাক্ষ্যলিপি। ‘৭০র প্রতিরোধের বয়ান তৈরী হলো মতাদর্শগত সংগ্রাম, রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম আর ঐ আরো আরো সংগঠিত হওয়ার তাগিদ থেকেই (Organise to Resist)। সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনের ধারা ঠিকানা পেলো শ্রেষ্ঠ মতাদর্শের। আপোসহীন লড়াইয়ের বুনিয়াদে গড়ে উঠলো সমাজতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের ভিত্তি। 

প্রায় নব্বই বছর পার করে ফ্যাসিবাদের সেই ঘোড়া ফের রেস কোর্সে।এবার নতুন জকি – ট্রাম্প, মোদী, বোলসোনারো। বদলেছে সময়, বদলেছে অসময়, বদলেছে জকির পোশাক জায়গাবিশেষে। বদলেছে ঘোড়ার রাস্তা, বদলালো স্পিড, তৈরী হয়েছে গ্লোবাল ব্যালকনি। পাশাপাশি হাতে হাত ধরে দাও লাগাচ্ছে বিশ্বের সব কর্পোরেট। মাঠে নেমেছে চোরা ফ্যাসিবাদ সঙ্গে প্রগতির মুখোশ। মিশে গেছে গ্লোবালাইজড্ মগজে বিরাজনীতির নেশার মতো। বাড়তে শুরু করেছে আক্রমণ , গ্লোবাল আক্রমণে গলা কাটার ছক তৈরী হয়েছে সমস্ত মানুষের : ছাত্র থেকে যুব, কৃষক থেকে শ্রমিক। নয়া ফ্যাসিবাদের নেটওয়ার্ক তার নিত্যনতুন রূপ বদলাতে মুখরোচক মোড়কে মুখ লুকিয়ে গড়তে শুরু করেছে একের পর এক মুখোশ। সেই নানা মুখোশকে সামনে রেখে চলছে মতামত নির্মাণের আবাধ জুয়া খেলা। সে মতামত চারপাশে গড়ে দেবে এক অদৃশ্য দেওয়াল, বানাবে নিত্যনতুন পরাবাস্তবের বুদবুদ। মন, মগজ, শিরদাঁড়া হবে পণ্য। আর সেই পণ্যের বাজার দখল করে রাখা দুনিয়ার তাবড় বড়োলোকেদের হাতে। শিক্ষা, কাজ, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, মজুরি সবই ঐ এক শতাংশের কুক্ষিগত। ব্যবস্থাটা চলছে ঐ এক শতাংশের জন্যই, ঐ এক শতাংশের স্বার্থেই! অথচ ব্যবস্থাটাকে টেনে নিয়ে চলেছে বাকি নিরানব্বই শতাংশ, যারা মরছে, অথবা বোকার মতো মারছে একে অপরকে, কিন্তু কিছুতেই পাচ্ছে না বাঁচার মতো রাস্তা।

এমত পরিস্থিতিতে , ক্যাম্পাসে কান পাতলে ফের শোনা যাচ্ছে ইতিহাসের ডাক – ‘Organise to Resist’ নয়া ফ্যাসিবাদের এই মারণ নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়তে চাই সর্বোচ্চ প্রতিরোধ, চাই সেই প্রতিরোধ রচনার সংগঠন। যাদের শিরায় উপশিরায় বইছে গত শতাব্দীর সভ্যতার সবচেয়ে ঘৃণ্যতম, দৈত্যাকার দুশমনের বিরুদ্ধে লড়ার ইতিহাস, তারাই পারে আজ এই যুদ্ধে নামতে। তারাই পারে সকলের জন্য শিক্ষা, কাজের কথা বলতে। এমন একটা সময়ে যখন শিক্ষাকে পরিণত করা হচ্ছে অপ্রাসঙ্গিকতায়, কাজকে অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, পরিযায়ী শ্রমে , তখন অনেক অনেক বেশী জোরে ধাক্কা দিতে হবে। বলতে হবেই চিৎকার করে- সবাই ভালো থাকবে যদি সব্বাই ভালো থাকে! পড়া, গড়া, লড়ার এই সূত্র ধরেই পৌঁছতে হবে আরো উন্নত কোনো মডেলে। সমাজতন্ত্রের দিকে। গণতন্ত্রের দিকে। স্বাধীনতার দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *